সাজেকনির্ভরতা কাটিয়ে পর্যটন অর্থনীতিতে নতুন গন্তব্যের খোঁজ
খাগড়াছড়িতে পর্যটক আসে অর্থনীতি কতটা জাগে!
শেয়ার বিজ
পাহাড়, ঝরনা, গুহা, লেক, বন আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে খাগড়াছড়ি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। ছুটির মৌসুমে আলুটিলা, রিছাং ঝরনা, তারেং, জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক, মায়াবিনী লেক ও মানিকছড়ি ডিসি পার্কে পর্যটকের ভিড় বাড়ে। কিন্তু পর্যটকের এই ভিড় সব সময় স্থানীয় অর্থনীতিতে সমানভাবে প্রভাব ফেলে না। বিশেষ করে সাজেকমুখী পর্যটকের বড় অংশ খাগড়াছড়িকে ব্যবহার করেন যাতায়াতের পথ হিসেবে; রাতযাপন ও কেনাকাটায় সময় কম দেওয়ায় হোটেল, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। ২০২৬ সালের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। এ উপলক্ষে দেশজুড়ে একযোগে কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
পর্যটক আছে, কিন্তু রাতযাপন কম: খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫টি হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। চলতি বছরের মার্চে ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে এসব আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধেক কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, অনেক পর্যটক সাজেক ঘুরে দ্রুত খাগড়াছড়ি ছাড়েন।
খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, জেলার পর্যটনকেন্দ্র তুলনামূলক কম হওয়ায় পর্যটকেরা বেশি সময় অবস্থান করেন না। অনেকেই সাজেক গিয়ে পরদিন ফিরে খাগড়াছড়ি ঘুরে দ্রুত চলে যান। পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
অর্থনীতির হিসাবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একজন পর্যটক যদি শুধু একটি স্পট দেখে চলে যান, তার ব্যয়ের পরিমাণ সীমিত থাকে। কিন্তু এক রাত অতিরিক্ত অবস্থান করলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, গাইড, দোকান, হস্তশিল্প ও স্থানীয় খাবারের ব্যবসায় অর্থ ছড়িয়ে পড়ে।
ঈদে ভিড়, তবু হোটেল ফাঁকা: চলতি বছরের ঈদুল আজহার সময় এর একটি ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। পর্যটনকেন্দ্র ও রেস্তোরাঁয় ভিড় থাকলেও জেলার অধিকাংশ হোটেল-মোটেলে পর্যাপ্ত বুকিং ছিল না। জেলা প্রশাসনের হিসাবে তখনও ৪৫টি হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউসের বেশির ভাগে পূর্ণ বুকিং হয়নি।
গ্রিন ভ্যালি হোটেলের ব্যবস্থাপক রহিত ত্রিপুরা জানান, তাদের ১০০ কক্ষের মধ্যে তখন মাত্র ২০টি বুকিং হয়েছিল। হোটেল অরণ্য বিলাসের ব্যবস্থাপক আহম্মদ রশিদ জানান, তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছিল এবং পর্যটক আকর্ষণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছিল।
অন্যদিকে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ছিল ভিন্ন চিত্র। স্বপ্নচূড়া রেস্টুরেন্টের মালিক নেইম্রা মারমা পর্যটক ও ক্রেতার চাপের কথা জানান। অর্থাৎ পর্যটক আসছেন, খাচ্ছেন, ঘুরছেন—কিন্তু তাদের রাতযাপন ও অবস্থানকাল বাড়াতে না পারলে পর্যটন অর্থনীতির বড় একটি অংশ অধরাই থেকে যাচ্ছে।
আলুটিলায় অবকাঠামোর সংকট: খাগড়াছড়ির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু চলতি বছরে কেন্দ্রটির ভেতরের সড়কের বেহাল দশা, ঝুলন্ত সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত কাঠের পাটাতন এবং পানি সরবরাহের সমস্যা দেখা যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সড়কের গর্ত ও ধুলাবালুর কারণে তাদের দোকানের পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পর্যটকেরাও বিরক্ত হচ্ছেন।
আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক চন্দ্র কিরণ ত্রিপুরা ঝুলন্ত সেতু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, এসব সমস্যা নিয়ে প্রশাসন কাজ করছে এবং সড়ক উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
নতুন আকর্ষণ, নতুন সম্ভাবনা: শুধু পুরোনো পর্যটনকেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে নতুন বিনোদন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। গত আগস্টে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কে ৮০০ ফুট দীর্ঘ জিপলাইন, জায়ান্ট সুইং ও শিশুদের কিডস জোন চালু করা হয়েছে। জিপলাইনের টিকিট ১০০ টাকা এবং জায়ান্ট সুইংয়ের টিকিট ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা বলেন, নতুন বিনোদন সুবিধা যুক্ত হলে পর্যটন খাত সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ জানান, পর্যটকদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এবং শিশুদের বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব সুবিধা চালু করা হয়েছে।
নতুন গন্তব্য গড়ে তোলার সুযোগ: খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সরকারি পর্যটন তালিকায় ৩০টি পর্যটন স্পট রয়েছে। এর মধ্যে হাজাছড়া ঝরনা, ঝরঝরি ছড়া, রামগড় ঝুলন্ত ব্রিজ, তৈদু ছড়া কুঞ্জ ঝরনা, মানিকছড়ি ডিসি পার্কসহ বিভিন্ন স্থান রয়েছে।
সমপ্রতি দীঘিনালার তোজেংমা ঝরনা নিয়েও পর্যটকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সেখানে যাতায়াত এখনো কিছুটা কষ্টকর। স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত যোগাযোগ ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এটি নতুন পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতির সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করা: পর্যটনের সুফল শুধু হোটেল-মোটেল বা পরিবহন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। পাহাড়ি খাবার, জুমের পণ্য, বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প, তাতের পোশাক, স্থানীয় ফলমূল ও কৃষিপণ্য পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা গেলে পর্যটকের ব্যয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় বাজারে থেকে যেতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে স্থানীয় গাইড, হোমস্টে, ক্ষুদ্র রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্পের দোকান এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন। এতে পর্যটন শুধু দর্শনীয় স্থান দেখার বিষয় না হয়ে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় আয়ের স্থায়ী উৎস হতে পারে।
দুর্যোগও বড় চ্যালেঞ্জ: পাহাড়ি জেলা হওয়ায় খাগড়াছড়ির পর্যটন বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপরও অনেকটা নির্ভরশীল। চলতি বছরের জুলাইয়ে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামোর পাশাপাশি পর্যটন খাতও ক্ষতির মুখে পড়ে। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা তখন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনার দাবি জানান।
এ কারণে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, ভারী বৃষ্টি ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।
প্রয়োজন ‘দেখে চলে যাওয়া’ নয়, ‘থেকে যাওয়ার’ পর্যটন: খাগড়াছড়ির সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পর্যটকের সংখ্যা নয়, পর্যটক কতক্ষণ থাকছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে কত টাকা রেখে যাচ্ছেন।
জেলার পর্যটনকে সাজেকের যাতায়াতনির্ভরতা থেকে বের করে আলুটিলা-রিছাংয়ের বাইরে নতুন গন্তব্য তৈরি, পুরোনো স্পটগুলোর অবকাঠামো সংস্কার, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত, স্থানীয় পণ্য ও সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো জরুরি।
একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা অনুযায়ী উন্নয়ন করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পর্যটনের চাপে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্যেও পর্যটনকে জেলার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলার দর্শনীয় স্থান ও পর্যটনকেন্দ্রের তালিকা সেই সম্ভাবনার ব্যাপ্তিও দেখায়।
পাহাড়ের সৌন্দর্য খাগড়াছড়ির বড় সম্পদ। এখন সেই সম্পদকে টেকসই পর্যটন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির শক্তিতে রূপ দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই শুধু পর্যটক বাড়ানোর নয়—পর্যটককে ধরে রাখার, স্থানীয় মানুষকে লাভবান করার এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করে পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনাই সামনে আসা প্রয়োজন।