সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা রহমান

প্রকাশ: ২৩:৪৩, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:১৫, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেয়ার বিজের বিরুদ্ধে রবি আজিয়াটার মামলা

অপিলেট ডিভিশনে শেয়ার বিজের পক্ষে স্থগিতাদেশ

অপিলেট ডিভিশনে শেয়ার বিজের পক্ষে স্থগিতাদেশ

শেয়ার বিজ

ঘটনার সূত্রপাত তথ্যভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে। মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রবি আজিয়াটার কয়েকটি অনিয়মের কথা উল্লেখ করে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক শেয়ার বিজ কড়চা। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম হিসেবে প্রকাশিত সংবাদে তথ্যসূত্র সঠিকভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি রবির বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হয়। প্রথম প্রকাশিত প্রতিবেদনে বক্তব্য দিলেও পরের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোয় বক্তব্য দেয়নি।  প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ না জানিয়ে গত ৩ আগস্ট ২০২৬ রাত ১১টা ২১ মিনিটে ই-মেইলের মাধ্যমে দৈনিক শেয়ার বিজকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠায় রবি। সেই নোটিশের উত্তর দেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয় মাত্র ৮ ঘণ্টা। পরের দিন সকালেই সেই নোটিশ নিম্ন আদালতে উপস্থাপন করে ৪১৪ কোটি মানহানির মামলা করার জন্য আবেদন করে রবি।
নিম্ন আদালতে মামলার গ্রহণযোগ্য শুনানির আগেই হাইকোর্টে একটি সিভিল রিভিশন আবেদন করে রবি। উচ্চ আদালত শেয়ার বিজ পত্রিকায় রবি-সংক্রান্ত কোনো মিথ্যা, বানোয়াট বা মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে। এরপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আদেশের বিরুদ্ধে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। আপিল বিভাগে শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগকে সংশ্লিষ্ট রুল দুই সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পক্ষদ্বয়কে মামলার ব্যাপারে স্থিতাবস্থা আদেশ বজায় রাখার নির্দেশ দেন। 
ঘটনার শুরুতে ফিরে গেলে প্রথমেই আসে শেয়ার বিজে প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘একীভূতকরণের প্রায় এক দশক পরও পৃথক ব্র্যান্ড এয়ারটেল’। রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেলের একীভূতকরণের প্রায় এক দশক পরও এয়ারটেল ব্র্যান্ড পৃথকভাবে পরিচালিত হওয়া এবং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের আগে রবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়। রবি আজিয়াটার পক্ষ থেকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যও প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়। ফলে শেয়ার বিজের প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাঠকের সামনে তুলে ধরার সুযোগ ছিল—এটি পুরো ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এরপর প্রকাশিত হয় ‘অবৈধ ভিওআইপিতে রবির ৫ হাজার ৯৩৫ সিম’ শিরোনামের প্রতিবেদন। এতে অবৈধ ভিওআইপিতে রবির সিম ব্যবহারের অভিযোগ এবং এ-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরিমানার তথ্য তুলে ধরা হয়। বিটিআরসির ২১ জুলাইয়ের নোটিশ অনুযায়ী, অবৈধ আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশনে ব্যবহূত ৮ হাজার ৬৮২টি সিমের মধ্যে রবির ছিল ৫ হাজার ৯৩৫টি। এ কারণে রবির ওপর ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার তথ্যও সামনে আসে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ও শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে রবির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রথম প্রতিবেদনের মতো এবার আর কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রবির পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো লিখিত বক্তব্য তাদের কাছে পৌঁছায়নি।
এরপর একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় জরিমানার অর্থ পরিশোধে রবির অবস্থান নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এখানে মূল বিষয় ছিল বিটিআরসির আরোপিত জরিমানার অর্থ পরিশোধ নিয়ে প্রশ্ন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের পর অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া কীভাবে এগিয়েছে, তা নিয়েই প্রতিবেদনটি করা হয়। এ ক্ষেত্রেও রবির বক্তব্য পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু বক্তব্য দেওয়ার আশ্বাস থাকলেও কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এরপর আসে আরও একটি প্রতিবেদন—‘অর্থ পরিশোধে ‘গ্র্যাচুইটি ফান্ড’ ব্যবহার করে রবি’। এই প্রতিবেদনে ভিআরএস ও সংশ্লিষ্ট অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্র্যাচুইটি ফান্ড ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আনা হয়। অর্থের উৎস, কর্মীদের পাওনা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধরে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
শেয়ার বিজের দাবি, এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগেও রবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু এখানেও কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ প্রথম প্রতিবেদনে রবির লিখিত বক্তব্য প্রকাশিত হলেও পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের বক্তব্য আর পাওয়া যায়নি। এরপর ঘটনাপ্রবাহে যুক্ত হয় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন—‘ওপেক্স-ক্যাপেক্স থেকে ইডটকো লেনদেন খতিয়ে দেখছে বিএসইসি’। এতে রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অনুসন্ধানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে রবি আজিয়াটার আর্থিক হিসাবের বিভিন্ন বিষয়, অপারেটিং ব্যয় বা ওপেক্সকে ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার বা ক্যাপেক্স হিসেবে দেখানোর অভিযোগ, ইডটকো গ্রুপের সঙ্গে লেনদেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, করপোরেট সুশাসন এবং তথ্য প্রকাশের বিষয় অনুসন্ধানের আওতায় থাকার কথা তুলে ধরা হয়। তবে অনুসন্ধান চলমান থাকায় এসব অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিএসইসির অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার কথা। এরপরই আসে সেই রাত, যা পুরো ঘটনাপ্রবাহের গতিপথ বদলে দেয়।
৩ আগস্ট ২০২৬। রাত ১১টা ২১ মিনিট। ই-মেইলের মাধ্যমে শেয়ার বিজের কাছে পৌঁছে রবির লিগ্যাল নোটিশ। অর্থাৎ লিগ্যাল নোটিশটি সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয় এবং ই-মেইল পাঠানোর সময় ছিল রাত ১১টা ২১ মিনিট। সংবাদ প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে এর আগে কোনো আনুষ্ঠানিক রিজয়েন্ডার বা প্রতিবাদপত্র শেয়ার বিজের কাছে পাঠানো হয়নি। বরং প্রথম প্রতিবেদনের পরবর্তী প্রতিবেদনগুলো নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো লিখিত বক্তব্য না আসার পর সরাসরি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই লিগ্যাল নোটিশে শুধু প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানানো হয়নি। শেয়ার বিজের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য ৮ ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৪১৪ কোটি টাকা পেনাল্টি/ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। অর্থাৎ রাত ১১টা ২১ মিনিটে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো নোটিশে শেয়ার বিজকে একদিকে তাদের প্রকাশিত সংবাদগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য মাত্র ৮ ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়, অন্যদিকে ৪১৪ কোটি টাকার আর্থিক দাবি তোলা হয়।
শেয়ার বিজের অবস্থান হলো, কোনো প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেদের বক্তব্য লিখিতভাবে দিতে পারে, তথ্যগত ভুল থাকলে তা জানাতে পারে কিংবা রিজয়েন্ডারের মাধ্যমে পাঠকের সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে। কোনো প্রতিবাদপত্রও দেওয়া হয়নি। বরং সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য ৮ ঘণ্টার সময় এবং ৪১৪ কোটি টাকার পেনাল্টি/ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—শেয়ার বিজের কাছে রবির পক্ষ থেকে কোনো রিজয়েন্ডার আগে পাঠানো হয়নি। পরবর্তী সময়ে অন্য একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে শেয়ার বিজ যে রিজয়েন্ডার প্রকাশ করেছে, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনা। সেটিকে রবির লিগ্যাল নোটিশের আগের কোনো রিজয়েন্ডার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শেয়ার বিজের অবস্থান হলো, রবির পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো নিয়ে কোনো রিজয়েন্ডার না দিয়েই সরাসরি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।
লিগ্যাল নোটিশে প্রকাশিত সংবাদগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য আট ঘণ্টার সময়সীমা এবং ৪১৪ কোটি টাকার আর্থিক দাবির বিষয়টি তাই পুরো বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে ওই নোটিশের জবাব দেওয়া হয়। তাদের অবস্থান ছিল, প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো তথ্য ও নথির ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে শেয়ার বিজ তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর পক্ষে অবস্থান নেয় এবং লিগ্যাল নোটিশের জবাব দেয়।
নোটিশের জবাব প্রদানের পরদিন গত ৪ আগস্ট ২০২৬ রবি শেয়ার বিজের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে মামলা করার আবেদন করে। তবে নিম্ন আদালতে করা আবেদন তখনও গ্রহণযোগ্যতার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। এর মধ্যেই ১০ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে আসে নিষেধাজ্ঞার আদেশ নিম্ন আদালতে করা আবেদনের গ্রহণযোগ্যতার শুনানির পূর্বে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা আদেশ প্রদান করে। এই বিষয়টি পরবর্তী সময়ে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে আইনি প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনা হয়।
এরপর ১৩ আগস্ট নিম্ন আদালতে শুনানি হয়। শেয়ার বিজের পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন নিম্ন আদালতে মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো শুনানি হয়নি। ১৬ আগস্ট পরবর্তীতে শুনানির দিন নির্ধারিত থাকলেও মামলার গ্রহণযোগ্যতার অপর কোনো শুনানি হয়নি। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর আবারও নিম্ন আদালতে বিষয়টি আসে। শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেহেতু আপিলাত ডিভিশন থেকে স্থিতাবস্থা আদেশ রয়েছে। সেহেতু এই মুহূর্তে মামলার গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে শুনানির সুযোগ নেই।
এদিকে আদালতের এই লড়াইয়ের মধ্যেই ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে অন্য গণমাধ্যমেও। সারাবাংলা ও ডিজি বাংলায় শেয়ার বিজকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শেয়ার বিজের অভিযোগ, ওই প্রতিবেদনগুলোয় তাদের আইনজীবীর বক্তব্য নেওয়া হয়নি; বরং রবির আইনজীবীর বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে পরে এর প্রতিবাদ জানিয়ে রিজয়েন্ডার প্রকাশ করা হয়।
এই রিজয়েন্ডারটি ছিল সম্পূর্ণ পরবর্তী ঘটনা। অর্থাৎ রবির লিগ্যাল নোটিশের আগে শেয়ার বিজের কাছে রবির কোনো রিজয়েন্ডার পাঠানো হয়নি—শেয়ার বিজের দাবি এমনই। পরে অন্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে একপেশে মনে করে শেয়ার বিজ নিজেই রিজয়েন্ডার প্রকাশ করে। ফলে দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখা জরুরি—একটি হলো রবির পক্ষ থেকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর আগে কোনো রিজয়েন্ডার না দেওয়া; অন্যটি হলো পরবর্তী সময়ে সারাবাংলা ও ডেইলি জি বাংলার প্রতিবেদনের প্রতিবাদে শেয়ার বিজের রিজয়েন্ডার প্রকাশ। এরপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আদেশের বিরুদ্ধে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। মামলাটি ছিল Civil Petition for Leave to Appeal No. 2904 & 2964 of 2026। আপিল বিভাগে শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া স্টে অর্ডারের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগকে সংশ্লিষ্ট রুল দুই সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পক্ষগুলোকে স্ট্যাটাস কো বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়।
এভাবে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পুরো ঘটনাপ্রবাহ বদলে যায়। যে বিষয়টির সূত্রপাত হয়েছিল একটি সংবাদ প্রতিবেদন দিয়ে, সেটি ধীরে ধীরে আরও কয়েকটি প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রথম প্রতিবেদনে রবির লিখিত বক্তব্য ছিল। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোর ক্ষেত্রে শেয়ার বিজের দাবি অনুযায়ী বক্তব্য চাওয়া হলেও আর কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কোনো রিজয়েন্ডারও দেওয়া হয়নি। এরপর আসে ৩ আগস্ট রাত ১১টা ২১ মিনিটে ই-মেইলে পাঠানো লিগ্যাল নোটিশ। সেখানে প্রকাশিত সংবাদগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য ৮ ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়া হয় এবং ৪১৪ কোটি টাকা পেনাল্টি/ক্ষতিপূরণের দাবি তোলা হয়। পরদিন নিম্ন আদালতে মামলা করার আবেদন। তার কয়েক দিনের মধ্যেই হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আদেশ। এরপর নিম্ন আদালতের একাধিক শুনানি। একই সময়ে গণমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও রিজয়েন্ডার। আর সবশেষে হাইকোর্টের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে যাওয়া এবং সেখান থেকে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা স্থগিতের আদেশ।
পুরো ঘটনাপ্রবাহের দিকে ফিরে তাকালে তাই এটি শুধু একটি লিগ্যাল নোটিশের গল্প নয়। এটি সংবাদ প্রকাশ, তথ্য ও নথির ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরির দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা, প্রথম প্রতিবেদনে বক্তব্য প্রকাশ, পরবর্তী প্রতিবেদনে বক্তব্য না পাওয়া, কোনো রিজয়েন্ডার না পাওয়া, সরাসরি ই-মেইলে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো, প্রকাশিত সব সংবাদ সরিয়ে ফেলার জন্য ৮ ঘণ্টার সময় দেওয়া, ৪১৪ কোটি টাকার পেনাল্টি/ক্ষতিপূরণের দাবি, এরপর নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট এবং শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার গল্প।
এ বিষয়ে আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগ রবি বা এর কর্মীদের সম্পর্কে কোনো মিথ্যা, বানোয়াট বা মানহানিকর বক্তব্য প্রকাশ করা থেকে শেয়ার বিজকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেয়ার বিজ ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে। আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ স্থগিত করেন এবং মামলার বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।’
‘হাইকোর্ট বিভাগ কোনো পর্যায়েই প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে রবি সম্পর্কে সঠিক তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশে শেয়ার বিজকে নিষেধ করেননি। ফলে রবি সম্পর্কে তথ্যগতভাবে সঠিক এবং যথাযথ প্রমাণসমর্থিত তথ্য প্রকাশে শেয়ার বিজের বিরুদ্ধে কখনো কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না—এখনো নেই।’
‘তবে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশের কারণে বিচারিক আদালতে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম বর্তমানে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রুল নিষ্পত্তির পরই মামলাটি গ্রহণের বিষয়ে শুনানি হতে পারে।’
শেয়ার বিজের অবস্থান হলো, তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সাংবাদিকতার দায়িত্বের অংশ হিসেবে তথ্য ও নথির ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে রবির পক্ষ থেকে লিগ্যাল নোটিশ এবং পরবর্তী আদালতকেন্দ্রিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। ফলে কোন প্রতিবেদনের কোন তথ্যের কী ভিত্তি, কোন অভিযোগের কী ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান কী—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জায়গা এখন বিচারিক প্রক্রিয়া।
সবশেষে এসে ঘটনাটি আবার সেই পুরোনো জায়গাটিকেই সামনে আনে—একটি সংবাদ কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধে রূপ নেয়, আর সেই বিরোধ কীভাবে সংবাদপত্রের পাতা পেরিয়ে আদালতের নথিতে জায়গা করে নেয়। এ লড়াইয়ের শুরু হয়েছিল একটি প্রতিবেদনে, যেখানে রবির বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর এসেছে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন; পরবর্তী প্রতিবেদনগুলো নিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও শেয়ার বিজের দাবি অনুযায়ী আর কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কোনো রিজয়েন্ডারও দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ৩ আগস্ট রাত ১১টা ২১ মিনিটে ই-মেইলে আসে লিগ্যাল নোটিশ—প্রকাশিত সংবাদগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য ৮ ঘণ্টার সময়সীমা এবং ৪১৪ কোটি টাকা পেনাল্টি/ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে। সেখান থেকে নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট এবং শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ। সংবাদপত্রের পাতায় শুরু হওয়া সেই অধ্যায়ের পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলো এখন আদালতের নথিতে। আর সেই নথির পরবর্তী বিচারিক ধাপই নির্ধারণ করবে দীর্ঘ এই আইনি বিরোধের পরবর্তী গতিপথ।