লোকসান কমেছে এসকে ট্রিমসের, বেড়েছে পরিচালন নগদ প্রবাহ
ছবি সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের লোকসান কমেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে অর্থাৎ জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমে এসেছে। একই সঙ্গে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহেও উন্নতি হয়েছে। তবে লোকসান কমলেও কোম্পানিটি এখনো নিট লোকসানে রয়েছে। এর পাশাপাশি এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভিপিএসও কমেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে প্রকাশিত কোম্পানিটির প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে এসকে ট্রিমসের শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস হয়েছে ঋণাত্মক ১ টাকা ৪১ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ২ টাকা ২১ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি লোকসান কমেছে ৮০ পয়সা।
কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচ্য সময়ে রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় কমেছে। এর ফলে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কর-পরবর্তী নিট লোকসান কমেছে। একই কারণে শেয়ারপ্রতি লোকসানের পরিমাণেও উন্নতি হয়েছে।
নয় মাসের সামগ্রিক ফলাফলের পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও এসকে ট্রিমসের লোকসান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে।
চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৭ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই লোকসান ছিল ৯০ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান কমেছে ৪৩ পয়সা।
এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৬১ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই লোকসান ছিল ৭৮ পয়সা।
অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকেও আগের বছরের তুলনায় লোকসান কমেছিল। পরবর্তী তৃতীয় প্রান্তিকে এসে লোকসানের পরিমাণ আরও কমে ৪৭ পয়সায় নেমেছে।
তবে প্রান্তিকভিত্তিক লোকসান কমলেও কোম্পানিটি এখনো লাভে ফিরতে পারেনি। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও ইপিএস ঋণাত্মক রয়েছে। ফলে কোম্পানিটির আর্থিক কার্যক্রমে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে এখনো লোকসানের অবস্থান থেকে বের হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানিটির নয় মাসের আর্থিক ফলাফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে শেয়ারপ্রতি লোকসানের হিসাবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে যেখানে শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ২ টাকা ২১ পয়সা, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ১ টাকা ৪১ পয়সা।
হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি লোকসান কমেছে ৮০ পয়সা। শতাংশের হিসাবে লোকসান কমার পরিমাণ প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ কোম্পানিটির লোকসান পুরোপুরি দূর না হলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় লোকসানের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
একটি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ইপিএস গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নিট মুনাফা বা লোকসানের সঙ্গে শেয়ারসংখ্যার সম্পর্কের মাধ্যমে এই সূচক নির্ধারিত হয়। ফলে ইপিএসের উন্নতি কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আর্থিক ফলাফলের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। এসকে ট্রিমসের ক্ষেত্রে ইপিএস ঋণাত্মক থাকলেও আগের বছরের তুলনায় ঋণাত্মক অবস্থার পরিমাণ কমেছে।
এসকে ট্রিমসের লোকসান কমার পেছনে রপ্তানি আয় বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কোম্পানি। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বৈদেশিক বাজার থেকে পাওয়া অর্ডার, পণ্য সরবরাহ এবং বিক্রয় আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রপ্তানি আয় বাড়লে কোম্পানির মোট বিক্রয় ও নগদ আদায়ে এর প্রভাব পড়ে।
এসকে ট্রিমসের ক্ষেত্রেও বিক্রয় বা টার্নওভার থেকে নগদ আদায় বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে কোম্পানি। এর ফলে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তবে শুধু আয় বাড়ার কারণেই লোকসান কমেনি। এর সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় কমে আসাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কোম্পানিটির ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে উৎপাদন ব্যয় কমেছে। একটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যয়ের বড় অংশই উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হয়। তাই উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এসকে ট্রিমস জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে উৎপাদন ব্যয় কমেছে। এর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ও কমেছে। ফলে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কর-পরবর্তী নিট লোকসান কমেছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলের উন্নতির পেছনে একই সঙ্গে আয় বৃদ্ধির এবং ব্যয় কমানোর প্রভাব রয়েছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকলে একটি কোম্পানির মুনাফার ব্যবধান বাড়তে পারে। এসকে ট্রিমসের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের প্রভাব এখনো মুনাফায় রূপ নেয়নি; তবে আগের বছরের তুলনায় লোকসানের পরিমাণ কমেছে।
লোকসান কমার পাশাপাশি এসকে ট্রিমসের পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ বা এনওসিএফপিএস হয়েছে ১ টাকা ১ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই সূচক ছিল ঋণাত্মক ৫৩ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ১ টাকা ৫৪ পয়সা উন্নতি হয়েছে।
কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বিক্রয় বা টার্নওভার থেকে নগদ আদায় বাড়ায় পরিচালন কার্যক্রমের নগদ প্রবাহে উন্নতি হয়েছে।
কোনো কোম্পানির আর্থিক অবস্থার ক্ষেত্রে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবই নয়, নগদ প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পণ্য বিক্রি বা সেবা দেওয়ার পর আয় হিসাবভুক্ত হলেও সেই অর্থ যদি দ্রুত নগদে আদায় না হয়, তাহলে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ তৈরি হতে পারে। এসকে ট্রিমসের ক্ষেত্রে বিক্রয় থেকে নগদ আদায় বাড়ায় পরিচালন কার্যক্রমের নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক অবস্থা থেকে ইতিবাচক হয়েছে।
আগের অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে যেখানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৫৩ পয়সা, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ১ পয়সা।
তবে লোকসান কমা এবং পরিচালন নগদ প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে একটি নেতিবাচক পরিবর্তনও দেখা গেছে। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভিপিএস।
২০২৬ সালের ৩১ মার্চ শেষে এসকে ট্রিমসের এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১১ টাকা ৬ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই সূচক ছিল ১৩ টাকা ১১ পয়সা। এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছে ২ টাকা ৫ পয়সা।
এনএভিপিএস একটি কোম্পানির মোট সম্পদ থেকে দায় বাদ দেওয়ার পর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য অবশিষ্ট সম্পদের শেয়ারপ্রতি মূল্যকে নির্দেশ করে। ফলে এই সূচকের পরিবর্তন কোম্পানির নিট সম্পদের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এসকে ট্রিমসের ক্ষেত্রে লোকসান অব্যাহত থাকায় এবং অন্যান্য আর্থিক পরিবর্তনের প্রভাবে এক বছরের ব্যবধানে এনএভিপিএস কমেছে।
এসকে ট্রিমসের চলতি অর্থবছরের নয় মাসের আর্থিক ফলাফলে আয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেলেও কোম্পানিটি এখনো লোকসানের মধ্যেই রয়েছে।
নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান ২ টাকা ২১ পয়সা থেকে কমে ১ টাকা ৪১ পয়সায় নেমেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে লোকসান ৯০ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ৪৭ পয়সা। পাশাপাশি পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ টাকা ১ পয়সা। অন্যদিকে এনএভিপিএস ১৩ টাকা ১১ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ১১ টাকা ৬ পয়সা।
ফলে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলে একই সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। লোকসানের পরিমাণ কমেছে এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ বেড়েছে। বিপরীতে নিট সম্পদমূল্য কমেছে এবং কোম্পানিটি এখনো নিট লোকসানে রয়েছে।
এসকে ট্রিমসের বর্তমান আর্থিক ফলাফলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় কমে আসার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আগামী সময়ে এই পরিবর্তন কতটা ধারাবাহিক থাকে, সেটিও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি অর্থবছরের কয়েকটি প্রান্তিকে লোকসান কমে আসা এবং পরিচালন নগদ প্রবাহ বাড়ার পরও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আর্থিক উন্নতির জন্য আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা প্রয়োজন।
কোম্পানিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় কমেছে। এই দুই পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবেই আগের বছরের তুলনায় নিট লোকসান কমেছে।
এখন কোম্পানিটির সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই প্রবণতা পরবর্তী সময়েও ধরে রাখা এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকে পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ বজায় রাখা। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে এসকে ট্রিমসের আর্থিক ফলাফল বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোম্পানিটি বর্তমানে লোকসানে থাকায় পরবর্তী সময়ে লোকসান আরও কমে আসে কি না এবং শেষ পর্যন্ত মুনাফায় ফিরতে পারে কি না, তা আর্থিক ফলাফলের ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের হিসাবে কোম্পানির ইপিএস আগের বছরের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকেও লোকসানের পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে পরিচালন নগদ প্রবাহ ইতিবাচক হয়েছে।
তবে এনএভিপিএস কমে যাওয়ার বিষয়টিও কোম্পানির আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ লোকসান কমার পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছে।
সব মিলিয়ে এসকে ট্রিমসের চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক চিত্রে লোকসান কমার প্রবণতা এবং পরিচালন নগদ প্রবাহের উন্নতি দেখা গেলেও কোম্পানিটি এখনো নিট লোকসানে রয়েছে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় কমার ফলে আর্থিক ফলাফলে উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানি। এখন এই উন্নতির ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকে এবং কোম্পানিটি লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরতে পারে কি না, সেটিই পরবর্তী আর্থিক ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।