পাওনা না মিটলে ক্রেস্টের ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ নয়
ছবি সংগৃহীত
বিনিয়োগকারীদের পাওনা অর্থ পরিশোধ ও নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউস ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেডের কোনো ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ বা কর্মপরিকল্পনা বিবেচনা করবে না বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নতুন করে যে কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়েছে, সেটিকেও আগের পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি এবং বাস্তবায়নযোগ্যতার দিক থেকে অসন্তোষজনক বলে মনে করেছে কমিশন।
এবার শুধু কাগজে-কলমে কর্মপরিকল্পনা জমা দিলেই বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না—বরং বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ, অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা এবং সেই অর্থ বাস্তবে পরিশোধের পরই নতুন কোনো পরিকল্পনা বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হবে বলে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের গ্রাহকদের পাওনা অর্থ ফেরত নিয়ে চলা অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে বিএসইসি।
সমপ্রতি ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠানো এক চিঠিতে কমিশনের এ অবস্থান জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম। বিএসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের দাখিল করা ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ এবং প্রতিষ্ঠানটির অতীত কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছে কমিশন।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির নতুন কর্মপরিকল্পনাতেও বিনিয়োগকারীদের পাওনা অর্থ পরিশোধের বিষয়ে সুস্পষ্ট, সময়ভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য কোনো রূপরেখা নেই। ফলে আগের পরিকল্পনার মতো নতুন পরিকল্পনাটিও কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ পাঠানো এক চিঠিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মতামতের ভিত্তিতে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের কর্মপরিকল্পনাকে ‘পুনরাবৃত্তিমূলক ও অসন্তোষজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল বিএসইসি। ওই পরিকল্পনায় বিনিয়োগকারীদের দাবি করা অর্থ কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছিল না। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে ডিএসইতেও কোনো অর্থ জমা দেয়নি।
এরপর ১৪ জুন ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের পক্ষ থেকে নতুন করে যে চিঠি দেওয়া হয়, সেটিও আগের পরিকল্পনারই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছে কমিশন। নতুন চিঠিতে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে নতুন কোনো বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, নির্দিষ্ট সময়সীমা কিংবা অর্থের উৎস সম্পর্কে কার্যকর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে কাগজে পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের বিষয়ে বিএসইসির বর্তমান অবস্থানের মূল বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা। কমিশনের দৃষ্টিতে শুধু একটি পরিকল্পনা জমা দেওয়া বা ভবিষ্যতে অর্থ পরিশোধের আশ্বাস দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তার দায় এড়াতে পারবে না।
বিএসইসি মনে করছে, প্রথমে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজকে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত পাওনার পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সেই অর্থ কোথা থেকে এবং কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। শুধু অর্থের উৎসের কথা বললেই হবে না; বাস্তবে অর্থের সংস্থান করে বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থাৎ, কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো নতুন কর্মপরিকল্পনা দাখিলের আগে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের প্রমাণ দেখতে চায় বিএসইসি। বিনিয়োগকারীদের পাওনা অর্থের একটি অংশ বা সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের প্রমাণ, অর্থের সংস্থান এবং পরবর্তী পরিশোধের বাস্তবসম্মত কাঠামো দেখাতে পারলেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনার সুযোগ তৈরি হবে।
এতে স্পষ্ট হয়েছে, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে শুধু ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি বা লিখিত আশ্বাসকে আর যথেষ্ট মনে করছে না কমিশন। বরং বাস্তবে অর্থ ফেরতের অগ্রগতি দেখানোই হবে পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের দাখিল করা নতুন কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে বিএসইসির আপত্তির অন্যতম কারণ হলো এর সঙ্গে আগের পরিকল্পনার মৌলিক পার্থক্য না থাকা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে একটি কর্মপরিকল্পনা তখনই কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যখন সেখানে পাওনা অর্থের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সূচি, অর্থের উৎস, কোন ধাপে কত টাকা দেওয়া হবে এবং কার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য থাকে।
কিন্তু ক্রেস্টের নতুন পরিকল্পনায় এসব বিষয়ের বিষয়ে কার্যকর ও যাচাইযোগ্য তথ্য না থাকায় সেটিকে আগের পরিকল্পনারই পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছে কমিশন। ফলে নতুন করে শুধু পরিকল্পনা দাখিল করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনায় আসার সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে।
কমিশনের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের পক্ষ থেকে কোনো কর্মপরিকল্পনা পাঠানো হলে সেটির সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির প্রমাণ থাকতে হবে। অর্থাৎ, পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নের প্রমাণ দেখাতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের সংকট নতুন নয়। ২০২০ সালের জুনে করোনাভাইরাস মহামারির চরম সংকটের সময় পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন শাখা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
হঠাৎ অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের শেয়ার ও সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে থাকা বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, গ্রাহকদের অর্থ ও সম্পদ মালিকপক্ষ আত্মসাৎ ও পাচার করেছে। এর ফলে বিপাকে পড়েন প্রায় ২২ হাজার বিনিয়োগকারী।
অনেক বিনিয়োগকারীর বিও হিসাবও ব্লক হয়ে যায়। ফলে তারা নিজেদের বিনিয়োগের ওপর স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারান। একদিকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা অর্থ আটকে যায়, অন্যদিকে নিজেদের শেয়ার বিক্রি বা অর্থ উত্তোলন করতে না পারায় দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে পড়েন অনেক গ্রাহক।
একটি ব্রোকারেজ হাউসের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো তাদের শেয়ার ও অর্থ নিরাপদে সংরক্ষিত থাকা এবং প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া। কিন্তু ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ঘটনায় সেই আস্থাই বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদউল্লাহ এবং তার স্ত্রী নিপা সুলতানাকে পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও প্রতারণার মামলা করা হয়।
ঘটনাটি শুধু একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সঙ্গে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তী সময়ে বিএসইসির তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারে তথ্য জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়। গ্রাহকের হিসাব ও লেনদেন-সংক্রান্ত তথ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে।
কারণ ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার শুধু দৈনন্দিন হিসাব পরিচালনার জন্য নয়; গ্রাহকের লেনদেন, শেয়ার, অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ঘটনায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তৎকালীন প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা খায়রুল বাশারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয় বিএসইসি। তাকে পুঁজিবাজারে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।
এ ঘটনা দেখিয়েছে, কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ দেখা দিলে শুধু প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে না; সংশ্লিষ্ট তদারকি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলেও তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিএসইসির সামপ্রতিক পদক্ষেপগুলোয় তাই দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ কমিয়ে আনা।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি প্রক্রিয়াগত বিষয় স্পষ্ট করেছে বিএসইসি। ডিএসইর ২০২১ সালের ১১ আগস্ট এবং ২০২২ সালের ৩ অক্টোবর দুটি সার্কুলারের উল্লেখ করে কমিশন জানিয়েছে, ট্রেড হোল্ডার কোম্পানির আবেদন সাধারণভাবে ডিএসইর মাধ্যমে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে এ-সংক্রান্ত সব চিঠি ডিএসইর মাধ্যমেই বিএসইসিতে পাঠাতে হবে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজকে।
এর ফলে শুধু অর্থ ফেরতের বিষয়েই নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রক্রিয়াও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বিএসইসি মনে করছে, বিদ্যমান নিয়ম মেনে আবেদন ও যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের তদারকি এবং মতামতও প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকবে।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএসইসিতে ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বা পরিচালনাগত দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আটকে গেলে সেটি কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে সমাধান করা হবে, তার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা।
তবে ক্রেস্টের ঘটনায় বিএসইসির সামপ্রতিক অবস্থান দেখাচ্ছে, শুধু পরিকল্পনা জমা দেওয়াই এখন আর যথেষ্ট নয়। পরিকল্পনার বাস্তবায়নও দেখতে চাইছে কমিশন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই অবস্থানের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে শুধু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখিয়ে দীর্ঘ সময় পার করার সুযোগ কমে আসবে।
পুঁজিবাজারে অনিয়ম ঠেকাতে বিএসইসি বর্তমানে বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে আগাম নোটিস ছাড়াই আকস্মিক ‘স্পট ইনস্পেকশন’ পরিচালনা করছে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কার্যক্রম এবং নথিপত্রের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া তথ্যের মিল আছে কি না, তা যাচাই করা।
আগাম নোটিস দিয়ে পরিদর্শন করা হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। বিশেষ করে গ্রাহকের অর্থ, শেয়ার, হিসাব, ব্যাক-অফিস তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ ধরনের তদারকি গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ঘটনায় ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারে তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর প্রযুক্তিনির্ভর হিসাব ব্যবস্থাপনা ও তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে শুধু কাগজপত্র নয়, প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত ও অপারেশনাল ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির আওতায় আসছে।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তার অন্যতম কারণ হলো পাওনা অর্থ ফেরতের অনিশ্চয়তা। একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ ও শেয়ার জমা রাখেন মূলত নিরাপত্তা এবং দ্রুত লেনদেনের প্রত্যাশায়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ আটকে থাকলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকই নয়, পুরো পুঁজিবাজারের ওপর আস্থার প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং গ্রাহক সম্পদের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের ঘটনা সামনে এলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও বিনিয়োগকারীদের সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের পাওনা নিষ্পত্তির বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিও জড়িত।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে বিএসইসির সর্বশেষ অবস্থানকে একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বার্তাটি হলো—বিনিয়োগকারীদের পাওনা অর্থ পরিশোধ না করে শুধু নতুন কর্মপরিকল্পনা বা আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথমে প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর অর্থের উৎস নিশ্চিত করতে হবে। তারপর বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। সেই পরিশোধের প্রমাণ এবং ভবিষ্যৎ নিষ্পত্তির বাস্তবসম্মত রূপরেখা থাকলেই কেবল নতুন কোনো কর্মপরিকল্পনা বিবেচনা করবে কমিশন।
অর্থাৎ, এখন থেকে ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ কেবল একটি লিখিত নথি হিসেবে নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে চায় বিএসইসি। ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে প্রতিষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত কী ধরনের কার্যকর উদ্যোগ নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ নতুন পরিকল্পনা দাখিলের চেয়ে বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াই হবে সেই পরিকল্পনার গ্রহণযোগ্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
বিএসইসির অবস্থানও ততক্ষণ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকার ইঙ্গিত মিলেছে—পাওনা পরিশোধের বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের নতুন কোনো ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ বিবেচনা করা হবে না।