৯ মাসে আমরা টেকনোলজিসের লোকসান বেড়েছে ৯০ শতাংশ
ছবি সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানি আমরা টেকনোলজিস লিমিটেডের আর্থিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও লোকসান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে প্রকাশিত কোম্পানিটির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আমরা টেকনোলজিসের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১ টাকা ৮৪ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৯৭ পয়সা। এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়েছে ৮৭ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এ বৃদ্ধি প্রায় ৯০ শতাংশ।
একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে শেয়ারপ্রতি লোকসান এভাবে বাড়াকে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচক হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। কারণ শেয়ারপ্রতি আয় বা লোকসানের পরিবর্তন কোম্পানির আয়, ব্যয় এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
শুধু ৯ মাসের হিসাবেই নয়, চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও কোম্পানিটির লোকসান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে আমরা টেকনোলজিসের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৬৫ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ লোকসান ছিল ৩৩ পয়সা।
ফলে এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়েছে ৩২ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এ বৃদ্ধি প্রায় ৯৭ শতাংশ। ৯ মাসের সামগ্রিক হিসাবের পাশাপাশি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও কোম্পানিটির আর্থিক পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
কোম্পানির দেওয়া তথ্যমতে, বিক্রি বা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ইপিএসসহ প্রধান আর্থিক সূচকগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যবসার আয় কমে গেলে একই সঙ্গে পরিচালন কার্যক্রম থেকে অর্থের প্রবাহেও চাপ তৈরি হয়। কোম্পানিটির ক্ষেত্রেও আয় কমে যাওয়ার প্রভাব আর্থিক ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানির জন্য নিয়মিত ব্যবসায়িক আয় ধরে রাখা এবং নতুন ব্যবসা ও সেবা থেকে রাজস্ব বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আলোচিত সময়ে আমরা টেকনোলজিসের আয় বা বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি কোম্পানিটির নগদ অর্থ সংগ্রহের পরিস্থিতিও আগের বছরের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। কোম্পানির তথ্যমতে, আলোচিত সময়ে নগদ অর্থ সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা এবং আর্থিক দায় মেটানোর ক্ষেত্রে নগদ প্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
একটি কোম্পানির মুনাফা বা লোকসানের পাশাপাশি নগদ প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিসাবের মুনাফা থাকলেও নগদ অর্থের ঘাটতি থাকলে নিয়মিত ব্যয়, সরবরাহকারীদের পাওনা এবং অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধে চাপ তৈরি হতে পারে। আমরা টেকনোলজিসের ক্ষেত্রেও নগদ অর্থ সংগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কোম্পানিটির আর্থিক পরিস্থিতিতে আরেকটি চাপ তৈরি করেছে অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় অর্থায়ন ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে নগদ প্রবাহে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
আয় কমার সময়ে অর্থায়ন ব্যয় বাড়লে কোম্পানির আর্থিক ফলাফলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ ব্যবসা থেকে আয় কমলেও অর্থায়ন-সংক্রান্ত ব্যয় বহাল থাকে বা বাড়তে পারে। ফলে মোট লোকসানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
আমরা টেকনোলজিসের ক্ষেত্রেও আয় কমে যাওয়া, নগদ অর্থ সংগ্রহ কমা এবং অর্থায়ন ব্যয় বাড়ার বিষয়গুলো একই সময়ে দেখা দিয়েছে।
তবে সব সূচকেই নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কোম্পানির তথ্যমতে, একই সময়ে পরিচালন ব্যয় এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় অনুকূলে ছিল।
অর্থাৎ ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে কোম্পানি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছে। কিন্তু এসব ইতিবাচক দিক আয় ও নগদ অর্থ সংগ্রহের দুর্বলতা এবং অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি। ফলে ৯ মাসের শেষে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
এদিকে গত ৩১ মার্চ ২০২৬ শেষে আমরা টেকনোলজিসের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৬২ পয়সা।
শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য একটি কোম্পানির সম্পদ ও দায়ের হিসাবের ভিত্তিতে শেয়ারপ্রতি মালিকানার একটি ধারণা দেয়। ফলে কোম্পানির লোকসানের পাশাপাশি এনএভিপিএসের অবস্থানও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস। বিশেষ করে ধারাবাহিকভাবে লোকসান বাড়তে থাকলে কোম্পানির ব্যবসায়িক সক্ষমতা, আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং নগদ প্রবাহের পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
আমরা টেকনোলজিসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—আয় কমেছে, নগদ অর্থ সংগ্রহ কমেছে এবং অর্থায়ন ব্যয় বেড়েছে। এর বিপরীতে পরিচালন ব্যয় ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে থাকার কথা জানিয়েছে কোম্পানিটি। সামগ্রিক ফলাফলে এর প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং প্রথম ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান ৯০ শতাংশ এবং শুধু তৃতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৯৭ শতাংশ বেড়েছে। আমরা টেকনোলজিস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. মনিরুল হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল ধরেননি।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসান বৃদ্ধি পেলে বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানির আয়, ব্যয়, নগদ প্রবাহ এবং অর্থায়ন ব্যয়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। আর্থিক প্রতিবেদনে যথাযথ তথ্য প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা টেকনোলজিসের ক্ষেত্রে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নগদ অর্থ সংগ্রহ কমেছে এবং অর্থায়ন ব্যয় বেড়েছে—এই তিনটি বিষয় উদ্বেগের। শুধু লোকসান কতটা বেড়েছে, সেটি দেখলে হবে না, কোম্পানির মূল ব্যবসা থেকে নগদ প্রবাহ তৈরি হচ্ছে কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাজস্ব পুনরুদ্ধার না হয় এবং অর্থায়ন ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ব্যবস্থাপনার উচিত আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় ও অর্থায়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
এখন কোম্পানিটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আয় ও নগদ প্রবাহের পরিস্থিতি ঘুরিয়ে আনা এবং অর্থায়ন ব্যয়ের চাপ কমানো। একই সঙ্গে ব্যবসার মূল কার্যক্রম থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রান্তিকগুলোতে আর্থিক ফলাফলের উন্নতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আয় ও নগদ সংগ্রহের দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে এবং অর্থায়ন ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকলে কোম্পানিটির আর্থিক পারফরম্যান্সে আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ের আর্থিক ফলাফলের দিকে এখন নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের। বিশেষ করে লোকসান কমিয়ে কোম্পানিটি আয় ও নগদ প্রবাহে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটিই আগামীতে আমরাটেকের আর্থিক অবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে।