রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ সাদী খান

প্রকাশ: ১৮:১৬, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আকাশে দুই ঘণ্টা বোয়িং ৭৩৭: অসতর্কতা নাকি অবহেলা

ক্যাপ্টেন আহমেদের নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ

ক্যাপ্টেন আহমেদের নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ

ছবি: সংগৃহীত

গত ২০ আগস্ট ঢাকা থেকে আবুধাবিগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩২৭ ফ্লাইটটিতে গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। উড্ডয়নের পর বিমানের ল্যান্ডিং গিয়ার অস্বাভাবিকভাবে ভাঁজ হতে (রিট্র্যাক্ট) ব্যর্থ হওয়ায় বোয়িং ৭৩৭-৮ই ৯ মডেলের উড়োজাহাজটি প্রায় দুই ঘণ্টা আকাশে চক্কর দিতে বাধ্য হয় এবং পরে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করে। তবে এই গুরুতর ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট সেফটি ডিপার্টমেন্টের কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং অভিযুক্ত ক্রুদের নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া নিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার চরম ঘাটতির প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে বিমানের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বোয়িং-৭৩৭ এর ফ্লাইটের কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহমেদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্বয়ং বিমানে। এবং এ বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আরও বেশি উদ্বেলিত। ক্যাডেট পাইলট নিয়োগের প্রচলিত নীতিমালা ও বিমানের (ওঅ্যান্ডএম) পলিসি লঙ্ঘন করে সাবেক বিমান বাহিনীর প্রধান ও বিমানের সাবেক চেয়ারম্যান এভিএম জামালউদ্দিনের সন্তানকে রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রকার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা  ছাড়াই এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনার অভিযুক্ত ক্রুকে পুনরায় ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া এভিয়েশন সেফটির জন্য এক বড় ধরনের হুমকি।

এদিকে এ বিষয় নিয়ে জানতে চেয়ে  বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ( বেবিচক)-এর সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা)  এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহ্?বুব খান ও সদস্য (প্রশাসন), (অতিরিক্ত সচিব) এস এম লাবলুর রহমানকে একাধিকবার ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে কল ও বার্তা দিয়েও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় প্রাথমিক ফ্লাইট সেফটি অকরেন্স রিপোর্টের মেইনটেন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার মূল কারণ ছিল বিমানের ককপিট বা কেবিন ফ্লোরে থাকা ম্যানুয়াল ল্যান্ডিং-গিয়ার এক্সটেনশন অ্যাক্সেস ডোরটি সঠিকভাবে বন্ধ করা ছিল না। কার্পেট বা অন্য কোনো বাধার কারণে দরজাটি খোলা ছিল। বোয়িং-এর স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর  অনুযায়ী, এই দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ না থাকলে ল্যান্ডিং গিয়ার উপরে উঠবে না।

বিমানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, পাইলটদের প্রি-ফ্লাইট বা প্রি-ডিপার্চার চেকের সময় এই দরজাটি পরীক্ষা করার কথা, যা তারা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া আকাশে গিয়ার লক হয়ে যাওয়ার পর বোয়িংয়ের চেকলিস্ট অনুযায়ী পাইলটদের এই দরজাটি খুলে আবার বন্ধ করার নির্দেশনা রয়েছে। মেইনটেন্যান্স পরিদর্শনে দরজাটি যেভাবে পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট যে ফ্লাইটে পাইলটরা এই জরুরি চেকলিস্টের ধাপগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করেননি।

এদিকে এভিয়েশন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ( ক্যাব) সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এটি চরম ‘প্রসিডিউরাল ভায়োলেশন’ বা কার্যপ্রণালি লঙ্ঘনের শামিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ‘এয়ারবোর্ন টেকনিক্যাল অ্যাবনরমালিটি’ ঘটার পর নিয়ম অনুযায়ী অপারেটরের সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অধীনে তাৎক্ষণিক অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ঘটনার দুই সপ্তাহ পরও বিমানের ফ্লাইট সেফটি বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, এমনকি ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্ল্যান পর্যন্ত সক্রিয় করা হয়নি, যা বিমান সংস্থার নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা নির্দেশ করে।

ল্যান্ডিং গিয়ারের সমস্যা নিয়ে বিমানটি কেন ১০,০০০ ফুটের ওপরে ক্লাইম্ব করল এবং ওভারওয়েট ল্যান্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত না নিয়ে যাত্রীদের চরম আতঙ্কের মধ্যে রেখে দুই ঘণ্টা আকাশে হোল্ডিং করানো হলো, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই সময়ে ডিরেক্টর ফ্লাইট অপারেশনস বা চিফ অব ফ্লাইট সেফটির কোনো কার্যকর হস্তক্ষেপ বা ক্রুদের সঙ্গে ওসিসি ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে যোগাযোগের অভাব ছিল স্পষ্ট ছিল বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে বিমানের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং যাত্রী সাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তারা বলছেন। তারা বলছেন, অবিলম্বে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার  এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার  বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত সত্যতা বের করা । এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।  প্রি-ডিপার্চার ওয়াক-অ্যারাউন্ড এবং কেবিন চেকিং প্রসিডিউর কঠোরভাবে পুনঃপর্যালোচনা করা। তদন্ত শেষ করে একটি স্বচ্ছ ‘সেফটি বুলেটিন’ প্রকাশ করা, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়।

এছাড়া প্রতিবেদনে ক্যাপ্টেন আহমেদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড মেথডস পলিসি এবং প্রচলিত ক্যাডেট পাইলট রিক্রুটমেন্ট নীতিমালার প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংবিধিবদ্ধ সংস্থার স্বচ্ছতা নীতিমালার পরিপন্থি।

বিমানের নিজস্ব সার্ভিস রুলস অনুযায়ী, যেকোনো টেকনিক্যাল বা অপারেশনাল ত্রুটির পর সংশ্লিষ্ট ক্রুর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তাকে নিয়মিত দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কোনো প্রকার ‘রেমিডিয়াল অ্যাকশন’ বা রি-ট্রেনিং ছাড়া তাকে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থার চরম শিথিলতাকে নির্দেশ করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যে দাবিগুলো এই প্রতিবেদনে আনা হয়েছে, তা স্বাধীন প্রশাসনিক তদন্ত ট্রাইব্যুনাল বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে খতিয়ে দেখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক দিক উন্মোচন করা হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয় যে, বিমানের তৎকালীন প্রশাসনের একাংশের সহযোগিতায় ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত’ হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির পুনর্বাসন ও পুনর্বহাল প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাপ্টেন আহমেদের বিরুদ্ধে আনীত অনভিজ্ঞতা বা অপেশাদারিত্বের অভিযোগ, এয়ারলাইন্সের বিপুল আর্থিক ক্ষতি (দুই ঘণ্টা হোল্ডিং ও ফ্লাইট ডাইভারশনের কারণে) এবং শত শত যাত্রীর চরম ভোগান্তির পরও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া এই ‘দায়মুক্তি সংস্কৃতি’রই বহির্প্রকাশ।

 আইনি ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের বাধ্যবাধকতা

বেসামরিক বিমান চলাচল আইন এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন গাইডলাইন অনুযায়ী, যেকোনো ককপিট ক্রুর নিয়োগ এবং পদোন্নতি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হতে বাধ্য হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য বিমানের মানবসম্পদ বিভাগের মূল নিয়োগ নথি, তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের কার্যবিবরণী এবং স্বাধীন অডিট জরুরি। এবং এভিয়েশন আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—যেকোনো ক্রুর নিয়োগ প্রক্রিয়া যদি বিতর্কিত বা নীতি-বহির্ভূত হয়, তবে তা পরোক্ষভাবে ফ্লাইটের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেলে, কারণ সেখানে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বা পারিবারিক প্রভাব অগ্রাধিকার পায়।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ল্যান্ডিং গিয়ারের মতো একটি টেকনিক্যাল ইমার্জেন্সিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং বিতর্কিত ব্যাকগ্রাউন্ডের পাইলটকে কোনো প্রকার ‘রেমিডিয়াল অ্যাকশন’ বা রি-ট্রেনিং ছাড়া নিয়মিত ফ্লাইট চালাতে দেওয়া একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। সিএএবি এবং মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে বিমানের এই নিয়োগের ফাইলটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া, অন্যথায় এটি দেশের সামগ্রিক এভিয়েশন সেফটি রেটিংকে আন্তর্জাতিকভাবে হুমকিতে ফেলবে।