রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

সাখাওয়াত সাব্বির, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১১:৩০, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ

ইউনিটেক্সের সুতা কারখানা চালুর এক বছরেই বন্ধ

ইউনিটেক্সের সুতা কারখানা চালুর এক বছরেই বন্ধ

ছবি সংগৃহীত

ব্যাংকঋণ ও অর্থায়ন সংকটে কাঁচামাল আমদানির এলসি খুলতে না পারায় চট্টগ্রামের আনোয়ারার এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনিটেক্স গ্রুপের এই কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টন। উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কারখানাটিতে পলিয়েস্টার ফুললি ড্রন ইয়ার্ন (এফডিওয়াই), ড্রন টেক্সচারড ইয়ার্ন (ডিটিওয়াই), ডোপ ডায়েড, মেলাঞ্জ, থিক-থিন, স্প্যানডেক্সযুক্ত এয়ার কাভার্ড সুতা ও টু-টোনসহ বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক সুতা উৎপাদনের কথা ছিল।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ২০২২-২৩ সালের তালিকা অনুযায়ী, কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি ৭৫ লাখ কেজি বা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টন। আর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) নথিতে কারখানাটিতে ৪৮০ জন শ্রমিকের তথ্য রয়েছে।

কারখানা-সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। শুরুতে প্রতিদিন প্রায় ৬০ টন সুতা উৎপাদন করা হতো। তবে কাঁচামাল আমদানিতে সংকট তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে উৎপাদন কমতে থাকে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের দিকে দৈনিক উৎপাদন ১৮ থেকে ২০ টনে নেমে আসে। পরে কাঁচামালের সরবরাহ না থাকায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। স্বাভাবিক উৎপাদন চালু রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টন কাঁচামাল প্রয়োজন হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার টন কাঁচামালের প্রয়োজন থাকলেও ওই সময়ে মাত্র প্রায় ৫০০ টন কাঁচামালের জন্য এলসি খোলা সম্ভব হয়েছিল। এতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি।

কারখানা-সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে আরও জানা যায়, কারখানায় ব্যবহূত কাঁচামাল চীন ও জার্মানি থেকে আমদানি করা হতো। মেশিনপত্রও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর অর্থায়ন সংকট তৈরি হলে কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়ে। রূপালী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে প্রত্যাশিত অর্থায়ন না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এরপর উৎপাদন কমানোর পাশাপাশি কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের শেষ মাসের বেতন ও শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে।

এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলসের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পেছনে ইউনিটেক্স গ্রুপের সামগ্রিক আর্থিক সংকটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে রূপালী ব্যাংক থেকে ৩২৬ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪৭ কোটি এবং এক্সিম ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা ঋণের তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের ঋণের মধ্যে ইউনিটেক্স স্টিলের নামে ৮১৪ কোটি, ইউনিটেক্স এলপিজির নামে ২ হাজার ২৩ কোটি, ইউনিটেক্স কম্পোজিট স্পিনিংয়ের নামে ৬০৭ কোটি এবং ইউনিটেক্স গ্র্যান্ড স্পিনিংয়ের নামে ২৯৩ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে।

ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতের মূল্য এবং কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও ইউনিটেক্সের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনিটেক্স-সংশ্লিষ্ট ইসলামী ব্যাংকের ঋণের একটি বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ঋণ আদায়ের জন্য বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

তবে ইউনিটেক্সের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলমান প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পুরো গ্রুপের ব্যবসায়ও পড়তে পারে।

বড় বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও কারখানাটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যেতে না পারায় স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানে এর প্রভাব পড়েছে।

ডিআইএফইর নথিতে ৪৮০ শ্রমিকের তথ্য থাকলেও কারখানা-সংশ্লিষ্টদের দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ পাঁচ শতাধিক মানুষ সেখানে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রাম চেম্বারের সদস্য তালিকাতেও এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডের নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এটি ইউনিটেক্স গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

কারখানাটির তৎকালীন মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসেন জানান, অর্থ ও কাঁচামাল সংকটের কারণে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। কাঁচামালের অভাবে পরে আর উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আমিও এখন সেখানে কর্মরত নেই। এই কারখানার বিষয়ে আমার আর বিস্তারিত জানা নেই।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সহ-সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী জানান, কোনো প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক নয়। ইউনিটেক্স গ্রুপের মালিকপক্ষের কেউ হয়তো বর্তমানে দেশে নেই। সরকার চাইলে এ ধরনের বন্ধ প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণের বিষয়টিও জড়িত। মালিকপক্ষকে ব্যাংক ঋণের বিষয়টি দ্রুত সুরাহা করতে হবে। সারা দেশে এভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতি দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়।

সরেজমিনে আনোয়ারার চাতুরী-চৌমুহনী এলাকায় গিয়ে এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডের কারখানাটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউনিটেক্স গ্রুপের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।