সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামে বিশাল শুল্ক ছাড়
১% কর ছাড়া সব মওকুফ করল এনবিআর
ছবি সংগৃহীত
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ঘাটতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ দ্রুত করতে বড় ধরনের নীতিগত সহায়তা ঘোষণা করেছে সরকার। সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে এখন থেকে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস ডিউটি এবং সমুদয় রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর থেকে পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে (এসআরও) জানিয়েছে, এই সুবিধার ফলে আমদানিকারকদের মোট করভার ১৭ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১ শতাংশে নেমে আসবে। এই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আমদানিকারকদের জন্যও এই শুল্ক সুবিধা উন্মুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী ১৮০ দিন (৬ মাস) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের জীবাশ্ম জ্বালানির (গ্যাস ও কয়লা) ওপর নির্ভরতা কমাতে এই সিদ্ধান্ত অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। শুল্ক প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনায় গ্রিন এনার্জি খাতে বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। এছাড়া সরকার ছাদ সোলার থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে ১০.৫০ টাকা হারে কেনার যে সুবিধা দিয়েছে, এই শুল্ক ছাড়ের ফলে সাধারণ মানুষ ও শিল্প মালিকরা সোলার প্যানেল স্থাপনে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আইইসি মান নিশ্চিত করা এবং আমদানিকৃত সরঞ্জাম কেবল সৌর খাতেই ব্যবহূত হচ্ছে কি না—তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যাতে সুবিধার অপব্যবহার না হয়।
সৌর বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়ী ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন ও আমদানিকারকদের মতে, এর আগে ১৭% করভারের কারণে সোলার প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারি ও ইনভার্টার আমদানির খরচ অনেক বেশি ছিল। এখন খরচ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে কম মূল্যে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে বলছেন, এবারই প্রথম সাধারণ বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বাজারে সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সরবরাহ তৈরি হবে। এবং মনোপলি বা একক আধিপত্যের সুযোগ থাকবে না।
নতুন নির্দেশনায় শুল্ক-কর হ্রাসকৃত প্রধান প্রধান সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ:
১. সৌর প্যানেল
২. ইনভার্টার
৩. মাউন্টিং স্ট্রাকচার (সোলার প্যানেল বসানোর কাঠামো)
৪. লিথিয়াম ব্যাটারি (ফটো ভোল্টাইক জেনারেটরের সঙ্গে ব্যবহূত)
৫. ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
৬. মনিটরিং ও কন্ট্রোল সিস্টেম
৭. সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রিলেটেড সিস্টেম ও যন্ত্রাংশ। (স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় এমন কিছু ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব ধরনের উপকরণ এতে অন্তর্ভুক্ত)
এদিকে এই শুল্ক ছাড়ের ফলে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে যেমন বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুবিধাসমূহ:
প্রকল্পের ব্যয় হ্রাস: সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও লিথিয়াম ব্যাটারির মতো মূল যন্ত্রাংশের আমদানি খরচ বিপুল পরিমাণে কমবে।
দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি: কম খরচে দ্রুত নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব হবে, যা বর্তমান ৩,০০০ মেগাবাইটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং কমাতে সাহায্য করবে।
শিল্প উৎপাদনে গতি: নিরবচ্ছিন্ন সস্তা বিদ্যুৎ নিশ্চিত হলে কারখানাগুলোর জ্বালানি খরচ কমবে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।
পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি নিরাপত্তা: জীবাশ্ম জ্বালানি বা আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে।
স্বল্পমেয়াদি সুবিধা: এই সুবিধাটি মাত্র ১৮০ দিন বা ৬ মাসের জন্য দেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বড় প্রজেক্টের পরিকল্পনা করা কঠিন হতে পারে।
লোডশেডিং মুক্তি: শিল্প-কারখানা ও বাসাবাড়িতে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং লোডশেডিং কমবে।
অসুবিধা:
স্থানীয় শিল্পের ধাক্কা: দেশে যেসব প্রতিষ্ঠান সোলার প্যানেলের মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ক্যাবল বা ছোটখাটো যন্ত্রাংশ তৈরি করে, তারা তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।
স্থানীয় শিল্পের ওপর প্রভাব: কিছু যন্ত্রাংশ যা দেশে তৈরি হয়, আমদানির কারণে স্থানীয় সেইসব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।
স্বল্পমেয়াদি সময়সীমা: সুবিধাটি মাত্র ৬ মাসের জন্য হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বড় বিনিয়োগকারীরা এলসি খোলা বা অবকাঠামো গড়তে পর্যাপ্ত সময় নাও পেতে পারেন।
তবে এনবিআর আশা করছে, এই শুল্ক ছাড়ের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন বাণিজ্যিক আমদানিকারক ও শিল্পমালিকরা। প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক আমদানিকারকদেরও এই বিশাল ছাড়ের আওতায় আনা হয়েছে। এতে করে সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিশেষ করে বাজারে সোলার পণ্যের দাম কমায় সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা (সোলার সেচ পাম্পের জন্য) কম খরচে এটি ব্যবহার করতে পারবেন।
তবে স্থানীয় কিছু ম্যানুফ্যাকচারার যারা কর পরিশোধ করে কাঁচামাল এনে পণ্য তৈরি করেন, তারা ১% শুল্কে আসা বিদেশি পণ্যের দামের সঙ্গে টিকতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেন তারা।
এদিকে সরকারের রাজস্ব কেমন আসবে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, এই নীতিমালার ফলে সরকারের প্রত্যক্ষ রাজস্ব সাময়িকভাবে অনেক কমে যাবে। আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের ওপর মাত্র ১% হারে কাস্টমস ডিউটি আসবে। ফলে এই খাত থেকে এনবিআরের কাস্টমস, ভ্যাট এবং অগ্রিম আয়কর বাবদ কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হবে।
এদিকে এনবিআর এই ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক অংক প্রকাশ করেনি জানিয়ে সূত্র বলে, তবে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গা হলে করপোরেট ট্যাক্স ও অন্যান্য খাত থেকে সরকার এই রাজস্ব ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারবে।
সুবিধার আড়ালে অন্য ব্যবসার সুযোগ বা অপব্যবহারের আশঙ্কা সম্পর্কে জানতে চাইলে সূত্র বলে, ব্যবসায়ীরা এই ব্যাপক কর ছাড়ের অপব্যবহার করে অন্য অনৈতিক ব্যবসা করতে পারেন। সোলার ইকুইপমেন্টের মোড়কে বা একই কন্টেইনারে উচ্চ শুল্কযুক্ত অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স বা বাণিজ্যিক যন্ত্রপাতি (যেমন- সাধারণ ব্যাটারি, কমার্শিয়াল ক্যাবল বা সাধারণ ইনভার্টার) আমদানির চেষ্টা হতে পারে। শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহারে অনেক সময় উন্নত দেশের ই-বর্জ্য বা পুরোনো লিথিয়াম ব্যাটারি নতুন হিসেবে দেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এবং পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে দেশের বাইরে অতিরিক্ত ডলার পাচার করার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে এসব অপব্যবহার রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতোমধ্যে কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে। যেমন, লিথিয়াম ব্যাটারির ক্ষেত্রে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের এই মর্মে সার্টিফিকেট লাগবে যে ব্যাটারিটি সম্পূর্ণ নতুন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড মেনে তৈরি। এছাড়া আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য শক্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যৌথ অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে যে এই মালামাল শুধু সৌর বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নেই ব্যবহূত হবে। তাছাড়া কাস্টমস হাউসে পণ্য খালাসের সময় সহকারী বা ডেপুটি কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তার কড়া নজরদারি ও সরাসরি অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।