রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ সাদী খান

প্রকাশ: ১১:৩৪, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা-কুমিল্লা প্রস্তাবিত কর্ড লাইন

ঢাকা-কুমিল্লা প্রস্তাবিত কর্ড লাইন

ছবি সংগৃহীত

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ঢাকা থেকে কুমিল্লা (লাকসাম) পর্যন্ত নতুন একটি ‘কর্ড লাইন’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রস্তাবিত এই কর্ড লাইন নির্মিত হলে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর ডুয়েল-গেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরিত হলে দুই শহরের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ কিলোমিটার কমে যাবে। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রামের ভ্রমণ সময় প্রায় তিন ঘণ্টা হ্রাস পেয়ে মাত্র ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে নেমে আসবে।

বর্তমানে সুবর্ণ ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের মতো বিরতিহীন ট্রেনগুলোয় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। বর্তমানে এই করিডোরটির আখাউড়া-লাকসাম এবং ঢাকা-টঙ্গী অংশ ব্যতীত বাকি অংশ প্রধানত মিটার-গেজ ডাবল লাইনে পরিচালিত হচ্ছে। নতুন এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণমুখী ট্রেনগুলোকে অত্যন্ত ব্যস্ত ঢাকা-টঙ্গী সেকশন এড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া হবে, যা রাজধানীর নিকটবর্তী রেল সেকশনের যানজট ও চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-কুমিল্লা (লাকসাম) প্রস্তাবিত প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিস্তারিত নকশা (এফএস ও ডিডি) পরিচালনার জন্য ৯৬১ দশমিক ৯৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ডাবল লাইন কনফিগারেশনের এই কর্ড লাইনটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে প্রকল্প পরিচালক আবিদুর রহমান শেয়ার বিজকে জানান, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের আশপাশে জমির উচ্চমূল্য এবং ফসলি জমি বাঁচিয়ে সেতু ও কালভার্টসহ বড় আকারের ভায়াডাক্ট (উড়াল সেতু) কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কারণেই এই প্রাক্কলন করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্প শুরুতে বিলম্ব হলে নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রয়োজন হবে, যা পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় এবং বাড়তি ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানান, এই কর্ড লাইনের মাধ্যমে ঢাকা ও কুমিল্লার মধ্যে নিয়মিত কমিউটার ট্রেন সেবা চালু করা সম্ভব হবে। এটি সাশ্রয়ী উপশহরী জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করবে। কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটার পাশাপাশি ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও যানজটের অতিরিক্ত চাপ কমাবে।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কর্ড লাইনটি শুধু যাত্রী পরিবহনেই নয়, চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রেনগুলোকে সহজেই প্রস্তাবিত ধীরাশ্রম, ঘোড়াশাল ও নিমতলী কন্টেইনার ডিপোতে (আইসিডি) যাতায়াতের সুযোগ করে দেবে। এ ছাড়া এই লাইনটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার  করিডোর এবং বিমসটেক আঞ্চলিক রুট হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কর্ড লাইনটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিবহন খাতে বাজার অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একটি কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা করবে। এ ছাড়া পরিষেবার পুনরাবৃত্তি এবং নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পেলে আরও বেশি যাত্রী ও পণ্যবাহী যান আকৃষ্ট হবে, যা সম্ভাব্য রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা। 

প্রকল্প নথিতে দেখা যায়, চুক্তি অনুযায়ী, সরকার এই প্রকল্পটি শুরু করতে বিলম্ব করলে একটি নতুন দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এর জন্য টিএপিপির অনুমোদন, নতুন দরপত্র আহ্বান এবং এফএস ও ডিডি সম্পন্ন করতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে। অধিকন্তু সেই সময়ে এফএস ও ডিডি পরিচালনার খরচ বর্তমান প্রাক্কলনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ে যদি পরবর্তী পর্যায়ে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করে, তবে সমীক্ষার ক্ষেত্রে শুধু পুনর্বাসন অংশটি হালনাগাদ করার প্রয়োজন হবে।

একাধিক কর্মকর্তারা জানান, কর্ড লাইন কুমিল্লা (লাকসাম) এবং ঢাকার মধ্যে ঘনঘন যাত্রী পরিষেবা চালুর মাধ্যমে উপশহরের উন্নয়নে সহায়তা করবে। এটি রাজধানী ঢাকার যানজট ও অতিরিক্ত জনসংখ্যা কমাবে, সাশ্রয়ী উপশহর জীবনযাত্রাকে উৎসাহিত করবে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করবে। কর্মসংস্থান ও পরিষেবার উন্নত সুযোগ নগরায়ণকে বিকেন্দ্রীভূত করবে, ব্যবসা আকর্ষণ করবে এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নে সহায়তা করবে, যা জাতীয় পরিবহন নেটওয়ার্ককেও শক্তিশালী করবে।

কর্ড লাইন নির্মিত হলে আঞ্চলিক উন্নয়নকে যেভাবে সহায়তা করবে

ট্রেনের ব্যবহার বৃদ্ধি: ভ্রমণের সময় হ্রাস পাওয়ায় প্রতিদিন একাধিক ট্রেন সেট চলাচল করতে পারবে, যার ফলে বিদ্যমান রোলিং স্টকের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং অতিরিক্ত ট্রেনের প্রয়োজনীয়তা কমবে।

 জ্বালানি ও শক্তি ব্যয় হ্রাস: ভ্রমণের সময় কম হওয়ায় জ্বালানি ও শক্তি খরচ কমবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

পরিচালনগত দক্ষতা বৃদ্ধি: দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল করবে, অলস সময় কমাবে এবং শ্রমিক খরচ হ্রাস করবে।

অবকাঠামোগত চাপ হ্রাস: পরিষেবার ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি এবং যানজট হ্রাস পাওয়ায় বিদ্যমান অবকাঠামোর উপর চাপ কমবে, যার ফলে ব্যয়বহুল উন্নয়ন ও মেরামত বিলম্বিত হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট হ্রাস

যাত্রীবাহী যান চলাচল স্থানান্তর: একটি দ্রুততর রেল বিকল্প প্রদান করলে তা সড়কপথ থেকে যাত্রীদের আকৃষ্ট করবে, ফলে যানবাহনের সংখ্যা কমবে এবং মহাসড়কের যানজট হ্রাস পাবে।

পণ্যবাহী যান চলাচল হ্রাস: রেলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা প্রদান করলে সড়ক পরিবহনের ওপর নির্ভরতা কমবে, ট্রাক চলাচল হ্রাস পাবে এবং সড়কের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

ভ্রমণের সময় হ্রাস: একটি নির্ভরযোগ্য রেল বিকল্প প্রদান করলে সড়কপথে ভ্রমণের চাহিদা কমবে, যার ফলে যান চলাচল আরও মসৃণ হবে।

পরিবেশগত সুবিধা: রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কমলে কার্বন নিঃসরণ কমবে, শব্দদূষণ হ্রাস পাবে এবং বায়ুর গুণমান উন্নত হবে।

বর্ধিত নিরাপত্তা: যানজট কম থাকলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে; এবং ফলস্বরূপ নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কর্ড লাইনটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার করিডোর এবং বঙ্গোপসাগর বহু-খাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া প্রস্তাবিত কর্ড লাইনটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য পরিষেবা সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহন খাতে বাজার অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং দেশের জন্য আরও সমন্বিত ও কার্যকর একটি পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার একটি কৌশলগত সুযোগ প্রদান করে। এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবহন সংযোগে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তারা।