বিষাক্ত গ্যাসে ঝরে গেল ৯ প্রাণ
সীতাকুণ্ডে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ডে’ মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি
ছবি সংগৃহীত
পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলেই আন্তর্জাতিক মান জাহাজ ভাঙা শিল্পের প্রতিষ্ঠানের অনুযায়ী পাওয়া সম্ভব ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ তকমা। সেই তকমা ঠিকই পেয়েছিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। কিন্তু নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ কাটার কাজ চলে সেখানে। যে কারণে গেল ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। কিন্তু তারপরও সুধরায়নি প্রতিষ্ঠানটি। যার খেসারত হিসেবে ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ঝরে গেল নয়টি তাজা প্রাণ। গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও কয়েকজন। তবে এই ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলতে নারাজ শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম, সেফটি মাস্ক ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা না থাকায় এতগুলো প্রাণ ঝরে গেছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, ছুটির দিনে বাধ্য করে কাজ করান হচ্ছিল। দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন ঘণ্টা কোনো উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়নি। এমনকি ঘটনাস্থলে একটি অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত ছিল না। ফায়ার সার্ভিস বলছে, এলএনজিবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজটির গ্যাস অপসারণ ছাড়াই কাটাকাটির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে হতাহতের ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকারস অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দুর্ঘটনার পেছনে প্রতিষ্ঠানটির দায় থাকলে তাদের বিচারের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রমিকরা জানান, গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সীতাকুণ্ডের ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে’ প্রতিদিনের মতো কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। মেশিন দিয়ে জাহাজের একটি অংশ কাটার সময় ট্যাংকিতে জমে থাকা মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ হয়। একপর্যায়ে বিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে এবং কাজ করতে থাকা শ্রমিকরা একে একে অসুস্থ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। দুর্ঘটনার পর পরই ইয়ার্ডের প্রধান গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় ভেতরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি জরুরি চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আনা হয়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এতে ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকরা পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে ইয়ার্ডের ভেতরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। দীর্ঘ সময় কোনো উদ্ধার তৎপরতা না দেখে একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা ও অন্য শ্রমিকরা গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং কারখানায় ভাঙচুর চালান। ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর বেলা ১১টার দিকে কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখান থেকে মৃত অবস্থায় দুই শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
চমেক হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইশতিয়াক রহমান জানান, ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ড থেকে দুই দফায় ১০ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আনা হয়েছিল। এদের মধ্যে ছয়জনকে মৃত অবস্থাতেই হাসপাতালে আনা হয় এবং বর্তমানে অপর একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া নগরের ন্যাশনাল হাসপাতালে মারা যান আরও একজন শ্রমিক। সব মিলিয়ে মোট ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) জুনায়েত কাউছার।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। হতাহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা আঙ্গুর মিয়া জানান, আমরা দুজন নিহতকে চিনি, তারা গাইবান্ধা জেলার মানুষ। কাজের সময়ই ট্যাংকি বিস্ফোরিত হয়ে এই বিপর্যয় ঘটে।
নিহত দুই ভাই মনছুর ও নাছিরের ভগ্নিপতি মহিউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খবর পেয়ে চমেক হাসপাতালে ছুটে এসেছি। আমার দুই শ্যালক মারা গেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত মালিকপক্ষের কোনো মানুষের দেখা মেলেনি।
অন্যদিকে সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন পলাশ জলদাস। তার স্ত্রী ভূমিকা জলদাস সাড়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আর কিছুদিন পরই ঘরে আসবে নতুন অতিথি। কিন্তু পলাশের সেই অপেক্ষা অপূর্ণ থেকে গেল। স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়া অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইডে পলাশের (৩০) মৃত্যু হয়।
দুপুরে ভাটিয়ারীর জলদাসপাড়ায় পলাশের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, যে ঘরে নতুন অতিথির অপেক্ষায় দিন কাটছিল, সেখানে এখন স্বজনদের আহাজারি।
পলাশের বাবা হরেন্দ্র জলদাস বলেন, প্রায় ১০ মাস আগে পাশের মাদামবিবির হাট জেলেপাড়ার ভূমিকার সঙ্গে পলাশের বিয়ে হয়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে পলাশ ছিল সবার বড়। আমার ছেলে সংসার চালাত। আগে সাগরে মাছ ধরত। কিন্তু এখন মাছ ধরে সংসার চলে না। তাই ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে কাটার ম্যান হিসেবে কাজ করত।
দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। ছুটির দিনে সরকারি নিয়ম তোয়াক্কা না করে কীভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চালানো হচ্ছিল—তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ক্ষুব্ধ স্থানীয় আক্কাস আলি বলেন, শুক্রবার কারখানা বন্ধ থাকার কথা থাকলেও পেটের দায়ে পড়া শ্রমিকদের দিয়ে জোড়াজুড়ি করে কাজ করানো হচ্ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এমন মারাত্মক কাজের সময় কোনো সেফটি টিমের লোক সেখানে উপস্থিত ছিল না।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক বলেন, দুর্ঘটনার পর ৩ ঘণ্টা কোনো উদ্ধার কাজ শুরু করা হয়নি, এমনকি একটা অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত ছিল না! এতগুলো মানুষ আহত-নিহত হলো, কারও গায়ে ন্যূনতম নিরাপত্তা সামগ্রী বা সেফটি মাস্ক ছিল না। এটা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় এখানে নিরাপত্তার ঘাটতি কতটা। একটি এলএনজি বা গ্যাসবাহী শিপ কাটার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শ্রমিকদের নামানো হলো কেন? আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ওই শিপইইয়ার্ডে গিয়ে কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান কর্মকর্তারা। এরপর এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর কয়েক দফা তাগিদ দেওয়ার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে কারখানাটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার বাদী হয়ে এ মামলাটি করেছিলেন।
অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার কারখানা পরিদর্শন করে বেশ কিছু নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর ৪ মে আবার পরিদর্শন করে আগের নির্দেশনার অগ্রগতি না দেখে তাগিদ দেওয়া হয়। পরে ৮ জুন চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে অগ্নি ও পেশাগত নিরাপত্তা জোরদারের চূড়ান্ত নোটিশ ও তাগিদপত্র দেওয়া হয়।
ঘটনাটিকে স্রেফ ‘দুর্ঘটনা’ বলতে নারাজ শ্রমিক সংগঠনগুলো। একে মালিকপক্ষের চরম অবহেলা ও খুন সমতুল্য গাফিলতি হিসেবে দেখছেন তারা। চট্টগ্রাম জেলা বাংলাদেশ শ্রমিক সংহতি ফেডারেশনের সভাপতি রূপন চৌধুরী বলেন, আজকে শিপইয়ার্ডে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা একান্তই মালিকের অবহেলার কারণে। মালিকের এই অবহেলায় ৯টি প্রাণ ঝরে গেল। সেখানে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তা দেখার দায়িত্বে থাকা সরকারি দপ্তরগুলো কোথায় ছিল? তারা যদি সঠিকভাবে গ্যাস লিকেজ, কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা বলয় তদারকি করত, তাহলে এই মর্মান্তিক মৃত্যু দেখত হতো না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে মুখে অনেক কথা বলা হয়, বাস্তবে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। কাগজ-কলমে যদি এই ইয়ার্ড এতই ‘গ্রিন’ হয়, এত নিরাপত্তা থাকে—তাহলে আজ এই দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল? যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান এই শিপইয়ার্ডকে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে সনদ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নিহতদের আজীবন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, ‘ওই জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করে শ্রমিকদের ঢোকানে হয়, যা মালিকপক্ষের গাফিলতি। তাছাড়া বন্ধের দিন সেখানে কাজ চলছিল। বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছেন, মূলত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস লিকেজ থেকেই এই বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয় এবং কাজের সময় নিরাপত্তা বলয় ও সরঞ্জামের অভাবই মৃত্যুকে ডেকে এনেছে।
ওই শিপইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার অনুমতি ছিল কি না, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ‘এই অনুমতি শুধু পরিবেশ দেয় না। বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ আরও কিছু সংস্থার অনুমতি প্রয়োজন হয়। আর ওই কোম্পানির কোন জাহাজটির অনুমোদন আছে আর কোনটির নেই, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছি না। কারণ পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় আমাদের পরিদর্শক যেতে পারেননি। তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা ও আহত শ্রমিকের চিকিৎসার খোঁজ নিতে যান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে তিনি জানান, শিপইয়ার্ডের এই ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এই কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে উদ্ধারকাজে বিলম্বের দায় অস্বীকার করে ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, সেফটি টিম প্রথমে গ্যাস লিকেজের বিষয়টি দেখতে পায় এবং তারা পরীক্ষা করতে গেলেই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। নিরাপত্তার স্বার্থেই তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে ইয়ার্ডে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
শিপ ব্রেকিং খাতের এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিএ)-এর পক্ষ থেকে নিহত প্রতিটি শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিবারকে এবং চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।