বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

শেয়ার বিজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩:৪৭, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ঢালাও ভর্তুকি কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তাগিদ আইএমএফের

ঢালাও ভর্তুকি কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তাগিদ আইএমএফের

ছবি সংগৃহীত

বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও ঋণের চাপ সামাল দিতে করব্যবস্থার সংস্কার, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে। তবে কর সংস্কার ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

গতকাল বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের তৃতীয় দিনে ‘ফিসক্যাল মনিটর’ বিষয়ক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য দেন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা দাবলা-নরিস এবং বিভাগের ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি। ব্রিফিংয়ে যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন থিলেন পাভিস দেবাহাসাদিন।

আইএমএফের মতে, ঢালাও ভর্তুকির বড় অংশ অনেক সময় দরিদ্রদের পরিবর্তে বেশি ভোগক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। ফলে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি না দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর রাজস্ব আয় বাড়াতে করের আওতা সমপ্রসারণ, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি প্রত্যাহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কর প্রশাসন সহজ ও কার্যকর করা গেলে কর আদায়ের ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো সম্ভব। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর পরিপালন সহজ করা হলে ব্যবসা সমপ্রসারণে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

এক্ষেত্রে মিশরের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার সংস্কার ও কর অব্যাহতি কমানোর উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার, জ্বালানি কর ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ এবং ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কলম্বিয়াকে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আইএমএফের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, কিছু দেশে কর প্রশাসনের উন্নয়নের মাধ্যমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় দুই শতাংশের সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি বেশি থাকা দেশগুলোর জন্য করের আওতা বাড়ানো এবং অকার্যকর কর সুবিধা পর্যালোচনা করা জরুরি। তবে এসব পদক্ষেপের কারণে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে কি না, তা বিবেচনায় নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ। সংস্থাটির বিশ্লেষণে মরক্কোর উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশটি সর্বজনীন ভর্তুকি ব্যবস্থা থেকে সরে এসে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি সামাজিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে ভর্তুকি প্রত্যাহার সব ক্ষেত্রে সহজ সমাধান নয়। নাইজেরিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের পর সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ পরিশোধের বড় ব্যয় অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। দেশটির রাজস্বের প্রায় ৪২ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হওয়ার বিষয়টিও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে।

ইথিওপিয়াও আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় কর বৃদ্ধি ও ভর্তুকি সংস্কারের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। তবে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম আর্থিক প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষতি সামাল দিতে আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা ও জরুরি তহবিল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামপ্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের পরও জ্যামাইকার আগাম অর্থনৈতিক প্রস্তুতিকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ সীমিত থাকলে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের অর্থ জোগাতে অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও জনসেবার মতো খাতে বরাদ্দ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জনসংখ্যার বার্ধক্য পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কর ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমে গেলে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়তে পারে। অন্যদিকে করদাতার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতিতে করের আওতা সমপ্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।

ঋণ সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তারল্য সহায়তা, ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো এবং ঋণ পুনর্গঠনকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছে আইএমএফ। এক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা হিসেবে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। এজন্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফের সুপারিশ অনুযায়ী, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শুধু ব্যয় কমানো বা ভর্তুকি প্রত্যাহার যথেষ্ট নয়; বরং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।