চট্টগ্রামবাসীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে চাই
ছবি সংগৃহীত
প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ যারা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন এবং সামগ্রিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। চট্টগ্রাম একটি দ্রুত সম্ক্রসারিত নগর। জনসংখ্যা বাড়ছে, নতুন নতুন আবাসিক ও শিল্প এলাকা গড়ে উঠছে। ফলে নিরাপদ পানির চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি বর্জ্যপানির ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ওয়াসার দায়িত্ব শুধু পানি উৎপাদন করা নয়, সেই পানি মানুষের ঘরে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যবহারের পর বর্জ্যপানি নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনার মধ্যেও রয়েছে। আমরা তাই সমস্যাগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে দেখছি না। পানি উৎপাদন বাড়ানো, পুরোনো পাইপলাইন পরিবর্তন, সিস্টেম লস কমানো, স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং গ্রাহকসেবা ডিজিটাল করার বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে চাই। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, যে পানি উৎপাদন করছি, সেটি যেন যথাসম্ভব কম অপচয়ে গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সামনে তাই দুটি কাজ—একদিকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, অন্যদিকে সিস্টেম লস কমানো। দুটো কাজ একসঙ্গে করতে পারলেই পানির ঘাটতি অনেকটা কমানো সম্ভব হবে।
কর্ণফুলী পানি শোধনাগার এলাকায় অতিরিক্ত ১০ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের চাহিদা মাথায় রেখে হালদা, কর্ণফুলী ও ভান্ডালজুড়িকে ঘিরেও পানি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে দৈনিক আরও ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কাজ করতে হবে। পতেঙ্গার পানি সংকট আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ঘাটতি কমাতে ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প থেকে অতিরিক্ত প্রায় দুই কোটি লিটার পরিশোধিত পানি পতেঙ্গায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশের টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া। উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টে দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার সক্ষমতার একটি আধুনিক পয়ঃশোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে পুরো ক্যাচমেন্টের বর্জ্যপানি নেটওয়ার্ক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। বর্জ্যপানি যদি শোধনাগারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেটি কার্যকর হবে না। তাই উত্তর কাট্টলী প্রকল্পে শোধনাগারের পাশাপাশি বর্জ্যপানি সংগ্রহ ও পরিবহনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন বিবেচনায় দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১ জুলাই ২৪২ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ওয়াসার প্রতিটি কাজ নিয়ম, নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হবে। অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সেটি যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পানি উৎপাদন, পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, সিস্টেম লস কমানো, স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক, পয়ঃশোধনাগার, ডিজিটাল গ্রাহকসেবা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার। তাই সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, কারিগরি সহযোগিতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সমর্থন প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম ওয়াসা জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই জনগণের প্রত্যাশার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সব সমস্যা এক দিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সমস্যা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা অবশ্যই করা যায়। আমি চাই চট্টগ্রামবাসী ওয়াসার প্রতি আস্থা রাখুন। একই সঙ্গে কোথাও সমস্যা থাকলে আমাদের জানান। নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া একটি বড় নগরের পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা টেকসইভাবে উন্নত করা সম্ভব নয়। আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার—চট্টগ্রামের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও টেকসই পানি সরবরাহ এবং আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সিস্টেম লস কমানোকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছি। পুরোনো ও জরাজীর্ণ পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, ডিস্ট্রিক্ট মিটারড এরিয়া বা ডিএমএ চালু, স্মার্ট মিটার স্থাপন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার—এসব পরিকল্পনার অংশ। কোন এলাকায় কত পুরোনো পাইপলাইন, কোথায় বেশি লিকেজ, কোথায় পানির চাপ কম—এসব বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও পরিমাপযোগ্য করতে চাই। গ্রাহকসেবাকে সহজ করা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিলিং ব্যবস্থা আরও উন্নত করার পাশাপাশি ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছি। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এখন সেবা পাচ্ছে মানুষ। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ওয়াসার গ্রাহকসেবাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য রয়েছে।