নিত্যপণ্যের বাজারে নাভিশ্বাস
আমদানি নীতিতে বড় ছাড়, বাড়ছে বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগও
ছবি সংগৃহীত
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম অস্বস্তি। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় প্রতিদিনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোক্তাদের। বাজারে ঢুকলেই বাড়তি দামের ধাক্কায় প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। বাড়তি দাম হওয়ায় চাহিদার চেয়ে কয়েকগুণ কম পণ্য কিনছেন। এর ফলে পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
সম্প্রতি বাজারদর নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ভোক্তারা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে বাজারের চিত্র খুব একটা বদলায় না। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার আগে কম দামে নিত্যপণ্য নিশ্চিত করার আশ্বাস দিলেও ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করে না। উল্টো এসব নিয়ে ভোক্তারা কথা বলতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, সবজি, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কোনো একটি পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অন্য কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক বাজারে স্বস্তি ফিরছে না।
সবজি বাজার ঘুরে দেখা যায়, টমেটো ১৪০-১৫০ টাকা, গাজর ১৪০-১৫০ টাকা, কাঁকরোল ৬০-৭০ টাকা, ঝিঙ্গা ৫৫-৬০ টাকা, চালকুমড়া (আকারভেদে) ৫৫-৬০ টাকা, কাঁচাকলার হালি ৪০ টাকা, গোল বেগুন ৭০-৮০ টাকা, পটোল ৫৫-৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০-৬৫ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, বরবটি ৭০-৮০ টাকা, করলা ৮০-৯০ টাকা, লাউ (আকারভেদে) ৫০-৮০ টাকা, কচুরলতি ৬০-৭০ টাকা, কচুরমুখী ৫০-৬০ টাকা এবং মিষ্টিকুমড়া কেজিপ্রতি ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া শুকনা মরিচ ৪৫০-৫০০ টাকা, দেশি আদা ২২০-২৪০ টাকা, দেশি রসুন ১০০-১২০ টাকা এবং ভারতীয় রসুন ১৮০-২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে কখনো উৎপাদন খরচ, কখনো পরিবহন ব্যয়, কখনো সরবরাহ সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া হয়। কিন্তু দাম বাড়ার পর তা আর আগের পর্যায়ে ফিরতে চায় না। ফলে আয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই।
যেকোনো সরকার নির্বাচনের আগে ভোক্তাদের আশ্বাস দেয়। তারা ক্ষমতায় এলে কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে পারবে ভোক্তারা। সবাই আশা দেখিয়ে ক্ষমতায় আসে, ক্ষমতায় আসার পর বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দেয়। কোনো ভোক্তা পণ্যের দাম কম রাখার কথা বললে উল্টো হেনস্তা হতে হয়। ভোক্তাদের জন্য কেউ কাজ করে না; না হলে বাজারে এমন অস্থিরতা থাকত না।
মালিবাগ কাঁচাবাজারে বেসরকারি চাকরিজীবী আনন্দ দে বলেন, বেতন যে হারে বাড়ে, বাজারের খরচ তার চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়ে। মাসের শুরুতেই বাজার করলে মনে হয় টাকা কোথায় চলে যাচ্ছে। মাসের শেষদিকে এসে অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বাজারের এমন অস্থিরতার পেছনে কারণ কী, সেটা সরকার কখনো নির্ধারণ করে না। যেকোনো সরকার-নির্বাচিত হওয়ার আগে নানা রকম আশ্বাস দেয়। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে গেলে এসব নিয়ে তাদের আর মাথা ঘামানোর সময় নেই। কোনো সরকারই জনগণের এসব বিষয়ের ওপর নজর দেয় না। না হলে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কেটে নিয়ে যাওয়া এভাবে জায়েজ করতে পারে না।
অন্যদিকে টাউনহল কাঁচা বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী তোফাজ্জল দাবি করেন, আমরা আমাদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারিনা। পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কেনায় পরিবহন, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ যোগ করে পণ্য বিক্রি করতে হয়। যার ফলে খুচরা বাজারে আমরা বেশি দরে পণ্য বিক্রি করতে হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, সরকার চাইলে খুচরা বাজারে মনিটরিং বাড়াতে পারে। কেন বেশি দরে খুচরা বাজার থেকে পণ্য বিক্রি হয়? তা নিয়ে কাজ করলে অনেকটা দর কমে আসবে। আমরাও চাই, ভোক্তাদের কম দামে পণ্য দেই। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে মনিটরিং না থাকায় সব পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়।
এদিকে বাজারদর নিয়ে ভোক্তাদের ক্ষোভের শেষ নেই। তবে অনেক ভোক্তা হেনস্তার ভয়ে তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। ভোক্তারা অভিযোগ করে বলেন, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন, আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বিপণন পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
?ভোক্তারা আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবারই কেন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, অথচ বাস্তবে বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না? ক্ষমতায় আসার আগে সবাই স্বস্তির বাজারের আশা দেখালেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর কেন সেই স্বস্তি অধরাই থেকে যায়?