উৎপাদনের চিহ্ন পেল না ডিএসই
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের কারখানা বন্ধ
ছবি সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কোম্কানিটির কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন করে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ অবস্থায় পেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। গতকাল রোববার ডিএসইর একটি পরিদর্শক দল কোম্কানিটির কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে সেখানে উৎপাদন কিংবা স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো চিহ্ন দেখতে পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে অনিয়ম, ‘জেড’ শ্রেণিতে অবস্থান, দুর্বল আর্থিক ভিত্তি এবং ঋণাত্মক নিট সম্কদমূল্যের মধ্যে কারখানার উৎপাদন বন্ধ পাওয়ার ঘটনায় কোম্কানিটির বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
গতকাল সোমবার ডিএসইর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের কারখানা পরিদর্শনের তথ্য প্রকাশ করা হয়। ডিএসইর পক্ষ থেকে সরেজমিন পরিদর্শনের বিষয়টি জানানো হলেও কারখানা কেন বন্ধ রয়েছে এবং কতদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ—সে বিষয়ে কোম্কানির পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ডিএসইর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জটির একটি পরিদর্শক দল সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের কারখানা প্রাঙ্গণে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। পরিদর্শনের সময় কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে কোম্কানিটির স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি। ফলে কোম্কানিটির বর্তমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাস্তবে কী অবস্থায় রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একটি উৎপাদনমুখী কোম্কানির ক্ষেত্রে কারখানার কার্যক্রম সচল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন বন্ধ থাকলে তা কোম্কানির বিক্রয়, আয়, মুনাফা এবং নগদ প্রবাহের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে কোম্কানির সম্কদ ব্যবহার, শ্রমিক-কর্মচারীদের কার্যক্রম এবং ব্যবসা পুনরায় চালুর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে এসব বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ কোম্কানিটি এরই মধ্যে আর্থিক ও তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে রয়েছে।
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো কোম্কানিটির আর্থিক তথ্য প্রকাশের ধারাবাহিকতা। কোম্কানিটি সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এরপর কোম্কানিটির আর্থিক কার্যক্রম ও ব্যবসার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্কর্কে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি কোম্কানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কোম্কানির আয়, ব্যয়, সম্কদ, দায়, মুনাফা বা লোকসান এবং সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার বিষয়ে ধারণা পান। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এসব তথ্য না থাকলে কোম্কানিটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থান সম্কর্কে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ক্ষেত্রেও হালনাগাদ আর্থিক তথ্যের ঘাটতির কারণে কোম্কানিটির বর্তমান ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে পূর্ণাঙ্গ চিত্র নেই। এর মধ্যেই ডিএসইর সরেজমিন পরিদর্শনে কারখানার উৎপাদন বন্ধ পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের দুর্বল অবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোম্কানিটির ‘জেড’ শ্রেণিতে অবস্থান। নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে না পারার কারণে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কোম্কানিটিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেওয়া হয়।
এজিএমের মাধ্যমে কোম্কানির আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম, লভ্যাংশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শেয়ারহোল্ডারদের সামনে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। নির্ধারিত সময়ে এজিএম করতে না পারা কোম্কানির করপোরেট গভর্ন্যান্স ও তথ্য প্রকাশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এ কারণে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একই সময়ে কোম্কানিটির শেয়ার কেনার জন্য ঋণ সুবিধা দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। ফলে কোম্কানিটির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে কারখানার বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় কোম্কানিটির সার্বিক ব্যবসায়িক অবস্থার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের আর্থিক ভিত্তিও বেশ কিছুদিন ধরে দুর্বল। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোম্কানিটির প্রতি শেয়ারের নিট সম্কদমূল্য ঋণাত্মক ৩ টাকা ৮১ পয়সা।
কোনো কোম্কানির নিট সম্কদমূল্য ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো কোম্কানিটির মোট দায় তার সম্কদের চেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতি কোম্কানির আর্থিক সক্ষমতার দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে একটি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের কারখানা বন্ধ থাকার সঙ্গে যখন ঋণাত্মক নিট সম্কদমূল্যের বিষয়টি সামনে আসে, তখন কোম্কানিটির ভবিষ্যৎ ব্যবসা পরিচালনা ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে শুধু নিট সম্কদমূল্য ঋণাত্মক হওয়া বা কারখানা বন্ধ পাওয়ার ভিত্তিতে কোম্কানিটির ভবিষ্যৎ সম্কর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারখানা বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ, কোম্কানির দায়-দেনার বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা এবং পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরই কোম্কানিটির সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের কারখানা বন্ধ থাকার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালেও ডিএসইর একটি পরিদর্শক দল কোম্কানিটির কারখানা ও প্রধান কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়েছিল। ওই সময়ও প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ও প্রধান কার্যালয় বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
শুধু তা-ই নয়, সে সময় ডিএসইর পরিদর্শক দল কারখানা ও কার্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে কয়েক বছর পর একই কোম্কানির কারখানা আবারও বন্ধ অবস্থায় পাওয়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
২০১৯ সালের পর থেকে কোম্কানিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম কতটা স্বাভাবিক ছিল এবং পরবর্তী সময়ে উৎপাদন কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্যের গুরুত্বও এখন বেড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান পরিদর্শনে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ পাওয়ার পর আগের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও বিনিয়োগকারীদের আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে কোম্কানি বা ডিএসইর পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তথ্যের প্রাপ্যতা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোম্কানির ব্যবসা সচল আছে কি না, উৎপাদন কতটা হচ্ছে, আর্থিক ফলাফল কেমন, ঋণের পরিমাণ কত, সম্কদ ও দায়ের অবস্থা কী—এসব তথ্যের ভিত্তিতেই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে একদিকে সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে, অন্যদিকে কোম্কানিটি ‘জেড’ শ্রেণিতে অবস্থান করছে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কারখানা বন্ধ পাওয়ার তথ্য। ফলে কোম্কানিটির প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থান সম্কর্কে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে কোম্কানির উৎপাদন বন্ধ থাকলে তার আর্থিক প্রতিবেদনে এর প্রভাব কীভাবে পড়েছে, কোম্কানির আয় ও ব্যয় কী অবস্থায় রয়েছে এবং ব্যবসা পুনরায় সচল করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্কষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন।
ডিএসইর সরেজমিন পরিদর্শনে কারখানা বন্ধ পাওয়ার পর এখন কোম্কানিটির পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা বন্ধের কারণ, উৎপাদন বন্ধের সময়কাল, বর্তমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং উৎপাদন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা সম্কর্কে কোম্কানির কাছ থেকে স্কষ্ট তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে কোম্কানিটির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ আর্থিক তথ্য না থাকায় কোম্কানিটির বর্তমান আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ হলে কোম্কানিটির আয়, ব্যয়, সম্কদ, দায় এবং নিট সম্কদমূল্যের বর্তমান পরিস্থিতি সম্কর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্কানির কারখানা বন্ধ পাওয়া গেলে বিষয়টি শুধু কোম্কানির ব্যবসার জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উৎপাদন বন্ধ থাকলে কোম্কানির ভবিষ্যৎ আয় এবং মুনাফা অর্জনের সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই কোম্কানির পক্ষ থেকে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে কারণ ব্যাখ্যা করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্কানিটি বর্তমানে ‘জেড’ শ্রেণিতে লেনদেন করছে। দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, নির্ধারিত সময়ে এজিএম করতে না পারা এবং আর্থিক তথ্য প্রকাশের ঘাটতির কারণে কোম্কানিটির অবস্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল।
ডিএসইর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কোম্কানিটির পরিশোধিত মূলধন ২৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। কোম্কানিটির মোট শেয়ার রয়েছে ২৩ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজারটি।
বড় পরিশোধিত মূলধনের একটি তালিকাভুক্ত কোম্কানির কারখানা বন্ধ পাওয়া এবং একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক তথ্য প্রকাশে ঘাটতি থাকার বিষয়টি পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোম্কানিটির বর্তমান পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত প্রকাশের বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের কারখানা বন্ধ পাওয়ার ঘটনা কোম্কানিটির দীর্ঘদিনের নানা দুর্বলতার মধ্যে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। উৎপাদন কেন বন্ধ, কোম্কানির বর্তমান আর্থিক অবস্থা কী, ব্যবসা পুনরায় সচল করার পরিকল্পনা আছে কি না এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য হালনাগাদ তথ্য কবে প্রকাশ করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ। ডিএসইর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং কোম্কানির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে এসব প্রশ্নের কতটা সমাধান হয়, সেদিকেই নজর থাকবে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের।