শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা রহমান

প্রকাশ: ২৩:০৯, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্চেন্ট ব্যাংকের লাগাম টানতে বদলাচ্ছে তিন দশকের বিধিমালা

মার্চেন্ট ব্যাংকের লাগাম টানতে বদলাচ্ছে তিন দশকের বিধিমালা

ছবি সংগৃহীত

প্রায় তিন দশকের পুরোনো বিধিমালাকে সময়োপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানের করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিশেষ করে মার্চেন্ট ব্যাংক ও পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের লাইসেন্সিং, যোগ্যতা-অযোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, কার্যক্রমের সীমা এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতি ফিডুশিয়ারি বা বিশ্বস্ততার দায়িত্বকে আরও সুস্পষ্ট করার দিকে নজর দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এ লক্ষ্যে ‘সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার) বিধিমালা, ১৯৯৬’ হালনাগাদ করতে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। সমপ্রতি কমিশনের আইন বিভাগের সিএমআরআরসি ডিপার্টমেন্ট থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কমিশনের পরিচালক মো. মাহমুদুল হককে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, সহকারী পরিচালক অমিত কুমার সাহা এবং সহকারী পরিচালক মেহরান আলী। মেহরান আলীকে সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাবসহ প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিতে বলা হয়েছে।

১৯৯৬ সালের বিধিমালার আওতায় দীর্ঘদিন ধরে দেশের মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে গত প্রায় তিন দশকে দেশের পুঁজিবাজারের আকার, বিনিয়োগের ধরন, আর্থিক পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন এবং ঝুঁকির ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের কার্যক্রম শুধু প্রচলিত ইস্যু ব্যবস্থাপনা বা আন্ডাররাইটিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। করপোরেট ফাইন্যান্স, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজ ও নতুন আর্থিক পণ্যের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

ফলে প্রায় তিন দশক আগে তৈরি বিধিমালার মাধ্যমে বর্তমান সময়ের সব ধরনের কার্যক্রম ও ঝুঁকি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিধিমালায় সংশোধন আনা হলেও বিএসইসির ওয়েবসাইটে থাকা সংস্করণটি সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ করা হয়েছিল।

নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে পুরোনো কাঠামোর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ঝুঁকিভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

নতুন বিধিমালায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে মার্চেন্ট ব্যাংকার হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টি স্পষ্ট করা। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে তার আর্থিক সক্ষমতা, পেশাগত দক্ষতা, পরিচালন সক্ষমতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কাঠামো কতটা কার্যকর—এসব বিষয় আরও নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে ফুল-ফ্লেজড মার্চেন্ট ব্যাংকারদের জন্য আলাদা সক্ষমতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে এবং কোন ধরনের কার্যক্রমের জন্য অতিরিক্ত সক্ষমতা প্রয়োজন হবে—তা বিধিমালায় স্পষ্ট করা হলে নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর হতে পারে।

এতে একদিকে সক্ষম ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন আর্থিক পণ্য ও সেবায় কাজের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে শুরুতেই নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে বিনিয়োগকারীদের প্রতি মার্চেন্ট ব্যাংকারদের ফিডুশিয়ারি দায়িত্ব নির্ধারণ।

মার্চেন্ট ব্যাংকার যখন কোনো বিনিয়োগকারীর অর্থ বা সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে, তখন তার ওপর বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দায়িত্ব থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত, গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা, বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকের অর্থ ও সম্পদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই নতুন কাঠামোয় মার্চেন্ট ব্যাংকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, গ্রাহকের স্বার্থের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের সংঘাত কিংবা দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে কী ধরনের জবাবদিহি থাকবে, তা আরও স্পষ্ট করার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্চেন্ট ব্যাংকারদের ওপর বিনিয়োগকারীর আস্থা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটি কতটা দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছভাবে গ্রাহকের অর্থ এবং বিনিয়োগ পরিচালনা করছে তার ওপর। তাই লাইসেন্স দেওয়ার পাশাপাশি লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির কাঠামোকেও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ইস্যু ব্যবস্থাপনা ও আন্ডাররাইটিংয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুন বিধিমালায় এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, সুকুক, এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তি এবং অন্যান্য কাঠামোবদ্ধ আর্থিক পণ্যের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট করা হতে পারে।

কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান কোন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, তার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন, জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো কী হতে হবে—এসব বিষয় নির্দিষ্ট করা হলে প্রতিষ্ঠানভেদে সক্ষমতা অনুযায়ী কার্যক্রম অনুমোদন করা সম্ভব হবে।

এতে একই ধরনের লাইসেন্স থাকলেও সক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। মার্চেন্ট ব্যাংকারদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে গ্রাহকের অর্থ ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা। এ কারণে নতুন বিধিমালায় গ্রাহকের অর্থ আলাদা রাখা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, হিসাব সংরক্ষণ, তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হতে পারে।

পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম বাড়ায় সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণ এবং গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক মার্চেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শুধু আর্থিক সক্ষমতা থাকলেই হবে না; প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, ১৯৯৬ সালের বিধিমালাটি অনেক পুরনো হওয়ায় বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় আপডেট করা হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের লাইসেন্সিংয়ের শর্ত, কার্যক্রম এবং যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, মূল বিষয়গুলোর একটি হলো মার্চেন্ট ব্যাংকারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ। বিশেষ করে ফুল-ফ্লেজড মার্চেন্ট ব্যাংকারদের কার্যক্রম এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতি ফিডুশিয়ারি ডিউটি বিবেচনায় নিয়েই বিধিমালা হালনাগাদ করা হবে। এর ফলে নতুন বিধিমালায় আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাইসেন্সিং ও তদারকি কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংকাররা পুঁজিবাজারের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী। তাই দীর্ঘদিনের পুরোনো বিধিমালা হালনাগাদ করার উদ্যোগটি সময়োপযোগী। বিশেষ করে লাইসেন্সিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, পেশাগত দক্ষতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন সক্ষমতার স্পষ্ট মানদণ্ড থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মার্চেন্ট ব্যাংকারদের ফিডুশিয়ারি দায়িত্ব নির্ধারণ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আরও কাঠামোবদ্ধ হতে পারে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, পেশাগত দক্ষতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন সক্ষমতা নিয়মিতভাবে মূল্যায়নের সুযোগ বাড়বে।

এতে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। অন্যদিকে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য ও সেবায় কাজের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিনিয়োগকারীর অর্থ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মার্চেন্ট ব্যাংকারদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি আরও স্পষ্ট হতে পারে। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আস্থা, স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর এর বাস্তব প্রয়োগই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু লাইসেন্সিং শর্ত কঠোর করা নয়, নিয়মিত তদারকি, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত করতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।