রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

রামিসা রহমান 

প্রকাশ: ২৩:৫৩, ২৯ আগস্ট ২০২৬

আগাম নোটিশ নয়, সন্দেহ হলেই ব্রোকারেজ হাউসে স্কট ইন্সপেকশন

আগাম নোটিশ নয়, সন্দেহ হলেই ব্রোকারেজ হাউসে স্কট ইন্সপেকশন

ছবি সংগৃহীত

ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কার্যক্রমে ঝুঁকি বা অনিয়মের কোনো ইঙ্গিত পেলেই এবার আগাম নোটিশ ছাড়াই আকস্মিক পরিদর্শন বা স্কট ইন্সপেকশন চালাবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসে গিয়ে প্রকৃত আর্থিক, হিসাব ও পরিচালন পরিস্থিতি যাচাই করবে যৌথ পরিদর্শক দল।
এজন্য বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী যৌথ প্যানেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আট সদস্যের এই প্যানেল থেকে ঝুঁকির ধরন বিবেচনায় তিন সদস্যের পরিদর্শন দল গঠন করা হবে। দলটি সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসে গিয়ে স্কট ইন্সপেকশন পরিচালনা করবে।
পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও সিকিউরিটিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকের অর্থের ঘাটতি, সিকিউরিটিজের হিসাবে গরমিল, মূলধন-সংক্রান্ত সমস্যা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং ব্যাক অফিস সফটওয়্যারে অনিয়মের মতো ঝুঁকিগুলো দ্রুত শনাক্ত করাই নতুন ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য।
বিএসইসির মার্কেট অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের (এমআইএডি) প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর তদারকি কেবল নির্ধারিত সময়ের নিয়মিত পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ঝুঁকির সংকেত পাওয়া গেলে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।
বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্কট ইন্সপেকশনের জন্য গঠিত স্থায়ী যৌথ প্যানেলে মোট আটজন প্রতিনিধি থাকবেন। বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এ প্যানেল গঠন করা হবে।
তবে আট সদস্যের পুরো প্যানেল প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউসে গিয়ে পরিদর্শন করবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঝুঁকি বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে ওই প্যানেল থেকে পরিস্থিতি ও ঝুঁকির ধরন বিবেচনা করে তিন সদস্যের একটি পরিদর্শন দল গঠন করা হবে। এই দলই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সরাসরি স্কট ইন্সপেকশন পরিচালনা করবে।
দল গঠন এবং পরিদর্শনের আদেশ জারির দায়িত্ব থাকবে বিএসইসির এমআইএডি বিভাগের কমিশনারের ওপর। বর্তমানে এ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন কমিশনার মো. নাফিজ আল তারিক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একাধিক নিয়ন্ত্রক ও বাজার অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ পরিদর্শন দল গঠন করা হলে কোনো ব্রোকারেজ হাউসের আর্থিক বা হিসাবসংক্রান্ত অবস্থার পাশাপাশি লেনদেন, সিকিউরিটিজ সংরক্ষণ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনাও একই সঙ্গে যাচাই করা সম্ভব হবে।
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্কট ইন্সপেকশনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসকে কোনো আগাম নোটিস দেওয়া হবে না। ফলে পরিদর্শনের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকবে না প্রতিষ্ঠানটির।
বিএসইসি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নিয়মিত পরিদর্শনের ক্ষেত্রে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই পরিদর্শনের সময়সূচি জানতে পারে। এতে পরিদর্শনের আগে হিসাব-সংক্রান্ত ঘাটতি সাময়িকভাবে পূরণ, প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত কিংবা কোনো কোনো ত্রুটি আড়াল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো ব্রোকারেজ হাউসের কাস্টমার কনসোলিডেটেড অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) অর্থের ঘাটতি থাকলে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে সাময়িকভাবে সেটি সমন্বয় করার চেষ্টা হতে পারে। একইভাবে সিকিউরিটিজের হিসাবে অমিল বা মূলধন-সংক্রান্ত সমস্যা থাকলেও পরিদর্শনের আগে নথিপত্র সাজিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার ঝুঁকি থাকে।
এ কারণে নতুন কাঠামোয় ঝুঁকির তথ্য পাওয়ার পর সরাসরি প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে বাস্তব অবস্থা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে কাগজপত্রের হিসাবের পাশাপাশি বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কত অর্থ ও সিকিউরিটিজ রয়েছে, সেগুলোর হিসাবও যাচাই করা সম্ভব হবে।
স্কট ইন্সপেকশনের জন্য নির্ধারিত কার্যপরিধি বা 
টার্মস অব রেফারেন্সে (টিওআর) পাঁচটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত হিসাব বা কাস্টমার কনসোলিডেটেড অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) অর্থের কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। ব্রোকারেজ হাউসের কাছে গ্রাহকদের যে অর্থ থাকার কথা, বাস্তবে তার সঙ্গে হিসাবের মিল রয়েছে কি না—এটি হবে পরিদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কারণ গ্রাহকের অর্থের ঘাটতি পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের সিসিএতে ঘাটতি থাকলে সেটি শুধু ওই ব্রোকারেজ হাউসের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়, একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
ব্রোকারেজ হাউসের সংরক্ষিত নথি এবং বাস্তব হিসাবের সঙ্গে সিকিউরিটিজের মিল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী যে পরিমাণ শেয়ার বা অন্যান্য সিকিউরিটিজ থাকার কথা, বাস্তবে সেই পরিমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করবে পরিদর্শক দল।
সিকিউরিটিজের হিসাবের অমিল বা ঘাটতি থাকলে তার কারণও খতিয়ে দেখা হতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের সম্কদ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে একটি স্কষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। স্কট ইন্সপেকশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্রোকারেজ হাউসের নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার নিরাপত্তা।
বর্তমানে পুঁজিবাজারের লেনদেনের বড় একটি অংশ প্রযুক্তিনির্ভর। গ্রাহকের হিসাব, লেনদেনের তথ্য, সিকিউরিটিজের তথ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সফটওয়্যারের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা হয়। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো দুর্বল হলে সেখানে তথ্য পরিবর্তন, অননুমোদিত প্রবেশ বা তথ্য হারানোর মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে স্কট ইন্সপেকশনের সময় ব্রোকারেজ হাউসের নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কতটা সুরক্ষিত, তা পরীক্ষা করা হবে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তা, সফটওয়্যারে অননুমোদিত পরিবর্তনের সুযোগ এবং ব্যাক অফিস ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পরিদর্শনের আওতায় আসতে পারে।
ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন পর্যাপ্ততা বা রিস্ক-বেজড ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি-সংক্রান্ত (আরবিসিএ) প্রতিবেদন যথাযথভাবে দাখিল করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে। ব্রোকারেজ হাউসের আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মূলধন পর্যাপ্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত মূলধন ছাড়া অতিরিক্ত ঝুঁকি নিলে ভবিষ্যতে তা বিনিয়োগকারী ও বাজার উভয়ের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী আরবিসিএ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করছে কি না, প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না্তএসব বিষয়ও পরিদর্শনে গুরুত্ব পাবে। ব্রোকারেজ হাউসগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবর্তন অযোগ্য বা নন-এডিটেবল ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করছে কি না। ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্রোকারেজ হাউসের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রাহকের হিসাব, লেনদেন, সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য তথ্য ব্যবস্থাপনায় এ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়।
কোনো সফটওয়্যারে পরবর্তী সময়ে লেনদেন বা হিসাবের তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ থাকলে প্রকৃত লেনদেনের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো অনিয়মের পর সেটির তথ্য পরিবর্তন বা আড়াল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে সফটওয়্যারের কাঠামো এবং সেখানে তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে কি না, তা বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হবে। এর মাধ্যমে ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেন ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
পুঁজিবাজারে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকিতে নিয়মিত পরিদর্শন একটি প্রচলিত ব্যবস্থা। তবে নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক আকস্মিক পরিদর্শন চালু হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কারণ নিয়মিত পরিদর্শনের ক্ষেত্রে সময়সূচি আগে থেকে জানা থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। বিপরীতে আকস্মিক পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক সময়ের আর্থিক ও পরিচালন পরিস্থিতি যাচাই করা সম্ভব।
বিশেষ করে সিসিএ ঘাটতি, সিকিউরিটিজের অমিল কিংবা প্রযুক্তিগত দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো যদি সাময়িকভাবে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে আগাম নোটিস ছাড়া পরিদর্শনের মাধ্যমে তা শনাক্ত করার সম্ভাবনা বাড়বে।
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সব ব্রোকারেজ হাউসে একযোগে স্কট ইন্সপেকশন চালানো হবে না। বরং ঝুঁকির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে।
অর্থাৎ কোনো ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট তথ্য, অভিযোগ, হিসাবের অসামঞ্জস্য কিংবা অন্য কোনো ঝুঁকির সংকেত পাওয়া গেলে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এরপর প্যানেল থেকে তিন সদস্যের দল গঠন করে ওই প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন চালানো হবে।
এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সময় ও জনবলও তুলনামূলকভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি বেশি, সেখানে আগে নজরদারি বাড়ানো যাবে। আবার ঝুঁকি কম এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই মাত্রার আকস্মিক পরিদর্শনের আওতায় আনার প্রয়োজন হবে না।
পুঁজিবাজারে ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিনিয়োগকারী ও বাজারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও সিকিউরিটিজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্কৃক্ততা রয়েছে।
ফলে কোনো ব্রোকারেজ হাউসের আর্থিক দুর্বলতা বা পরিচালনগত অনিয়ম সরাসরি বিনিয়োগকারীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গ্রাহকের অর্থের ঘাটতি বা সিকিউরিটিজের হিসাবে গরমিল হলে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এ কারণে নতুন স্কট ইন্সপেকশন কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা। আগাম সতর্কতার ভিত্তিতে পরিদর্শন চালানো গেলে সম্ভাব্য অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিএসইসি, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ ও সিডিবিএলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্যানেল গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অংশের তথ্য ও কার্যক্রম ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আওতায় থাকায় যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে একাধিক উৎসের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা সম্ভব হবে।
বিএসইসি নিয়ন্ত্রক হিসেবে তদারকি করে। ডিএসই ও সিএসই লেনদেন ও ব্রোকারেজ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্কৃক্ত। অন্যদিকে সিডিবিএল সিকিউরিটিজের কেন্দ্রীয় ডিপোজিটরি অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বিত অংশগ্রহণে পরিদর্শন হলে একটি ব্রোকারেজ হাউসের আর্থিক ও অপারেশনাল অবস্থার তুলনামূলক পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে দেওয়া তথ্য এবং বাজার অবকাঠামোর তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে সেটিও শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। বিনিয়োগকারীরা যখন কোনো ব্রোকারেজ হাউসে অর্থ জমা করেন বা শেয়ার লেনদেন করেন, তখন তারা প্রত্যাশা করেন তাদের অর্থ ও সিকিউরিটিজ যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের ঘটনা ঘটলে শুধু সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন না, পুরো বাজারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা বাজারের সামগ্রিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। ঝুঁকি শনাক্ত করার পর কত দ্রুত পরিদর্শন করা হচ্ছে, পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তীতে সেই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নতুন কাঠামোর সফলতা নির্ধারণ করবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগাম নোটিস ছাড়াই পরিদর্শনের সুযোগ থাকলে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মধ্যে নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বাড়তে পারে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো জানবে, নির্ধারিত সময়ের বাইরেও যেকোনো সময় তাদের কার্যক্রম যাচাই হতে পারে।
ফলে শুধু পরিদর্শনের আগে হিসাব বা নথিপত্র ঠিকঠাক রাখার পরিবর্তে নিয়মিতভাবেই সিসিএ, সিকিউরিটিজ হিসাব, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, মূলধন পর্যাপ্ততা ও ব্যাক অফিস সফটওয়্যার সঠিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এতে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, প্রয়োজন হলে ব্রোকারেজ হাউসে স্কট ইন্সপেকশন করা হবে। এটি নিয়মিত পরিদর্শনের বিকল্প নয়; বরং ঝুঁকির ভিত্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী আকস্মিক পরিদর্শন করা হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। আগাম নোটিস ছাড়া পরিদর্শনের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা সহজ হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ব্রোকারেজ হাউসের ওপর ঝুঁকিভিত্তিক ও আকস্মিক নজরদারি পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ আগাম নোটিসের ভিত্তিতে পরিদর্শন হলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে হিসাব বা নথিপত্র গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। আকস্মিক পরিদর্শনের ফলে গ্রাহকের অর্থ, সিকিউরিটিজ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা সম্ভব হবে। তবে পরিদর্শনে অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু পরিদর্শন নয়, জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
ব্রোকারেজ হাউসে ঝুঁকি বা অনিয়মের ইঙ্গিত পেলেই আগাম নোটিস ছাড়া স্কট ইন্সপেকশনের সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজার তদারকিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। আট সদস্যের স্থায়ী যৌথ প্যানেল এবং সেখান থেকে ঝুঁকির ভিত্তিতে তিন সদস্যের পরিদর্শন দল গঠনের কাঠামো করা হয়েছে এ লক্ষ্যেই।
সিসিএতে গ্রাহকের অর্থের ঘাটতি থেকে শুরু করে সিকিউরিটিজের গরমিল, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, আরবিসিএ প্রতিবেদন এবং ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের পরিবর্তনযোগ্যতা—সব মিলিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নজর দেওয়া হবে।
তবে শুধু পরিদর্শন করলেই হবে না; পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে তার ভিত্তিতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন এ ব্যবস্থা ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ওপর ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও সিকিউরিটিজের নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আস্থা বাড়াতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।