শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

​​​​​​​নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:০১, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

বিদেশি পণ্য আমদানিতে কয়েক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা

বিদেশি পণ্য আমদানিতে কয়েক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা

ছবি সংগৃহীত

কম শুল্কের পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে উচ্চ শুল্কের প্রসাধনী, গাড়ির যন্ত্রাংশ, নাট-বল্টু, বিয়ারিং ও অন্যান্য পণ্য আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস।

গতকাল শনিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ তথ্য জানিয়েছে। আটটি ঘটনায় পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা, অতিরিক্ত পণ্য আমদানি এবং কাস্টমসের লক করা কন্টেইনারের সিল পরিবর্তনের অপচেষ্টার তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।

এনবিআর জানায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি কন্টেইনারের সিল খুলে কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। এতে কৃষিকাজে ব্যবহূত পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, টুথপিক, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার ও স্টেইনলেস স্টিলের মতো কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন পণ্য আনার প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব চালানে নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, ফেস মাস্ক, অ্যান্টি-এজিং জেল, বিএসটিআই নিষিদ্ধ ক্রিম, লেজার লাইট, গাড়ির দামি ইঞ্জিন পার্টস, বিয়ারিং, নাট-বল্টু ও স্ক্রু পাওয়া গেছে।

এসব ঘটনায় আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ এক বিবৃতিতে জানান, ঢাকার নিউমার্কেটের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু কন্টেইনার খুলে পাওয়া যায় স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, এলইডি লাইট, সানগ্লাস ও ব্ল্যাক হেয়ার শ্যাম্পু। ঘোষিত পণ্যের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি অতিরিক্ত পণ্যও পাওয়া যায়। এ চালানে আনুমানিক আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

পুরান ঢাকার চকবাজারের কাফ করপোরেশনের একটি চালানে চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে পরীক্ষায় টুথপিক পাওয়া যায় মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল পাকিস্তানের গোরি বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, সানগ্লাস ও যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রে। এর মধ্যে বিএসটিআই কর্তৃক নিষিদ্ধ ক্রিমও ছিল। এ চালানে আনুমানিক ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছে বলে জানানো হয়।

ঢাকার এইচআর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে ১৬ হাজার ৪০ কেজি ইঞ্জিন রবার বুশ আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় প্রকৃত রবার বুশ পাওয়া যায় ৬ হাজার ৬২৫ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটরযান যন্ত্রাংশ। এ ঘটনায় আনুমানিক ৪৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি চালানে কমিশনারের পূর্বানুমতি ছাড়া এইচএস কোড পরিবর্তনের আবেদনের অপচেষ্টাও ঠেকানো হয়েছে।

এছাড়া চীনের হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণার আড়ালেও মিথ্যা পণ্য ঘোষণার ঘটনা ধরা পড়েছে। নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স নামের প্রতিষ্ঠানটি ২৩ হাজার ৬১৮ কেজি হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দিলেও পরীক্ষায় পেপার পাওয়া যায় মাত্র ৩ হাজার ১৬০ কেজি। বাকি প্রায় ২১ হাজার ৪৬৭ কেজি পণ্যের মধ্যে ছিল উচ্চ শুল্কের পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার। এ চালানে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে।

এ ছাড়া স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল ও এক্সকাভেটর গিয়ার আমদানির ঘোষণার আড়ালে বিপুল পরিমাণ নাট-বল্টু, স্ক্রু ও বিয়ারিং আনার তথ্য পাওয়া গেছে। বংশালের নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ এবং ওয়ারীর মোহাম্মাদীয়া ট্রেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের চালানে এসব পণ্য পাওয়া যায়।

মোহাম্মাদীয়া ট্রেড ২২ টন স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল ও এক্সকাভেটর গিয়ার আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষায় ঘোষিত পণ্যের মধ্যে পাওয়া যায় মাত্র ৩ দশমিক ৮ টন। বিপরীতে কন্টেইনারে ২২ হাজার ১১৩ কেজি নাট, বল্টু ও স্ক্রু পাওয়া যায়। এ চালানে আনুমানিক ৩২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের চালানে ১৭ হাজার ৫৯২ কেজি নাট-বল্টু, ২ হাজার ৭৮৭ কেজি ভারী রোলিং বিয়ারিং এবং ২ হাজার ৩৩৬ কেজি রিভলভিং চেয়ারের গ্যাস লিফট সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এ ঘটনায় আনুমানিক ৪২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছে।

এনবিআর জানায়, তবে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা ঘটেছে কাফ করপোরেশনের আরেকটি চালানে। কন্টেইনারটি ইয়েলো লেনভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি শুল্ক ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সিআইসি ও কাস্টমসের এআইআর শাখা সেটি অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক করে রেখেছিল। এরপরও কায়িক পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখের আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর কন্টেইনারটি অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এনবিআর জানায়, কন্টেইনারের মূল সিল ভেঙে সেখানে নতুন সিল লাগানো হয়। বদলি হয়ে যাওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে এবং বিভিন্ন কৌশলে কন্টেইনারটি সরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে নথিপত্র যাচাইয়ে তথ্য মিলেছে। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর কন্টেইনারটি কঠোর নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে জব্দ করা হয়েছে।

সিআইসি ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর শাখার যৌথ অভিযানে এসব ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কাস্টমসের ডিজিটাল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার নজরদারির কারণে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা ও কন্টেইনারের সিল পরিবর্তনের অপচেষ্টা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।