বিএনপি ক্ষমতায়, কিন্তু আমরা ক্ষমতায় আসি নাই, শিমুলিয়ায় ত্যাগীদের কষ্টের দীর্ঘ নিঃশ্বাস
ছবি সংগৃহীত
বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু ত্যাগী নেতাকর্মীরা কি সত্যিই ক্ষমতার অংশীদার হতে পেরেছেন? দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা হামলা, জেল জুলুম ও নির্যাতনের অভিযোগ মোকাবিলা করে যারা দলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন, আজ তাঁদেরই অনেকের রাজনৈতিক মঞ্চে জায়গা নেই, বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই, এমনকি দলীয় অনুষ্ঠানে যথাযথ সম্মানটুকুও জোটে না এমন অভিযোগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাভার উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
আসন্ন শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা। তৃণমূলের একাংশের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন দলের দুঃসময়ে পাশে থাকা নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে যদি অতীতে ভিন্ন রাজনৈতিক নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের দলীয় সমর্থন দেওয়া হয়, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবদানের মূল্যায়ন কোথায় দাঁড়াবে?
এ প্রশ্ন এখন শুধু দলীয় মনোনয়ন ঘিরে নয়, এটি বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং তৃণমূলের প্রতি নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবেও সামনে আসছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময় দলের অনেক নেতাকর্মী মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে। কেউ ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন, কেউ জীবিকা ও পারিবারিক নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত থেকেছেন। রাজনৈতিক মাঠে প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকা কঠিন হয়ে পড়লেও অনেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁদের একটি অংশের অভিযোগ, দুঃসময়ে যাঁরা সামনে ছিলেন, তাঁরা এখন পেছনের সারিতে চলে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে দলীয় কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত থাকা কিছু ব্যক্তি নিজেদের বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, স্থানীয় ত্যাগী নেতাকর্মীদের বক্তব্য, দলীয় পরিচয় কেবল পদবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার কিংবা নির্বাচনের আগে জনসংযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয় নয়। দলের দুঃসময়ে কে কী ভূমিকা রেখেছেন, কে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কে প্রতিকূলতার মধ্যেও আদর্শে অটল ছিলেন, সেসব বিবেচনায় নিয়েই নেতৃত্ব নির্ধারণ করা উচিত।
শিমুলিয়া ইউনিয়নের জিরানী, টেংগুরী, কলেজপাড়া, গোহাইলবাড়ী, রাঙামাটি ও আমতলা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অতীতের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির পরিচয় দেওয়া কিছু ব্যক্তি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা, প্রচার কার্যালয়ে উপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। কারও কারও বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে যাঁরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রকাশ্যে চলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা এখন কোন সাংগঠনিক ভিত্তিতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের সমকক্ষ দাবি করছেন?
রাজনীতিতে মতাদর্শের প্রশ্ন এড়িয়ে কেবল ক্ষমতার সমীকরণে অবস্থান বদলানোর প্রবণতা কোনো দলের সাংগঠনিক ভিত্তির জন্যই ইতিবাচক নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় আত্মগোপনে থাকা বা প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে না পারাকে এককভাবে দলত্যাগের প্রমাণ হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করতে হবে নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
৫ আগস্টের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরছেন এমন ব্যক্তিদের নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।
কিন্তু তৃণমূলের প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক ত্যাগ, দুঃসময়ে দলের পাশে থাকার ভূমিকা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্যায়ন বাদ দিয়ে কেবল প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে কি নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা সম্ভব?
একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু নির্বাচনী প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দলের প্রতি আনুগত্য, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক সংকটে ভূমিকা এসবই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
অতএব, শিমুলিয়া ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা এবং তাঁদের সাংগঠনিক অবদান যাচাইয়ের দাবি উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে তৃণমূলের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।
আসন্ন শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের তৎপরতা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কয়েকজনের প্রার্থিতার আগ্রহ ও প্রচার-প্রচারণা নিয়ে আলোচনা চললেও চূড়ান্ত দলীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া কাউকে মনোনীত বা মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় দলীয় সমর্থন নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে, প্রার্থীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা, দলের প্রতি আনুগত্য, সাংগঠনিক দক্ষতা, অতীত নির্বাচনে তাঁর অবস্থান, স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মানসিকতা।
কেউ অতীতে অন্য রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে থাকলে সেই অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনা, প্রমাণ যাচাই এবং দলীয় গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলাবিধি অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের ভিত্তিতে কাউকে বাদ দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি প্রমাণিত দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গকে উপেক্ষা করাও সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবুর নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন শিমুলিয়া ইউনিয়নের বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি অংশ। তাঁদের প্রত্যাশা, স্থানীয় নেতৃত্ব ও দলীয় সমর্থন নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক অবদান এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তৃণমূলের প্রত্যাশা, দলীয় সিদ্ধান্ত যেন কোনো ব্যক্তির প্রভাব, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা সাম্প্রতিক প্রচার-প্রচারণার ওপর নির্ভরশীল না হয়। বরং যাঁরা দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হোক।
রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে দুঃসময়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় সংগঠনের সঙ্গে থাকা মানুষদের অবদান উপেক্ষিত হলে ভবিষ্যতে নতুন কর্মীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হতে পারে। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা বড় হয়ে উঠলে সাংগঠনিক আদর্শ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিমুলিয়া ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও তাই প্রশ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দলীয় নেতৃত্ব কি দীর্ঘদিনের ত্যাগ, আনুগত্য ও সাংগঠনিক অবদানকে প্রাধান্য দেবে, নাকি অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কেবল নির্বাচনী সক্ষমতার হিসাবেই সিদ্ধান্ত নেবে?
এখানে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী বা দলবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। আবার রাজনৈতিক পদ-পদবি দাবি করলেই তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। সত্য যাচাই, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং দলীয় শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করা সম্ভব।
শিমুলিয়া ইউনিয়নের আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি চেয়ারম্যান পদে কে বসবেন, সেই প্রতিযোগিতা নয়,এটি স্থানীয় রাজনীতিতে ত্যাগ, আনুগত্য, জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহির মূল্য কতটা তারও একটি পরীক্ষা।
যাঁরা দুঃসময়ে দলের পাশে ছিলেন বলে দাবি করছেন, তাঁদের অবদান যথাযথভাবে যাচাই ও মূল্যায়ন করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি যাঁদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রমাণভিত্তিক ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা জরুরি।
তৃণমূলের প্রত্যাশা, দলীয় নেতৃত্ব এমন সিদ্ধান্ত নেবে, যাতে প্রকৃত সাংগঠনিক কর্মীরা বঞ্চিত না হন এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব সামনে আসে। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সংগঠনের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায়।
শিমুলিয়ার রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন? দলীয় সমর্থনের মাপকাঠি কী হবে: দুঃসময়ের পরীক্ষিত ভূমিকা, নাকি সুসময়ের রাজনৈতিক তৎপরতা? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নয়, স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় আদর্শ ও জবাবদিহির অবস্থানও নির্ধারণ করতে পারে।
১৭ বছরের ত্যাগের মূল্য কোথায় দুঃসময়ের পরীক্ষিত সৈনিক, নাকি সুসময়ের সুবিধাভোগীরা হবেন দলীয় মনোনয়নের দাবিদার?এটাই এখন সাধারণ জনগনের প্রশ্ন।