মুনাফা করেও ৭ মিউচুয়াল ফান্ডে লভ্যাংশ নেই
ছবি সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৯টি মিউচুয়াল ফান্ড ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ইউনিটহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে সাতটি ফান্ড মুনাফা করলেও ইউনিটহোল্ডারদের কোনো নগদ লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিপরীতে বাকি দুটি ফান্ডের মধ্যে আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড ৪ শতাংশ এবং রিলায়েন্স ওয়ান দ্য ফার্স্ট স্কিম অব রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ড ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সাতটি ফান্ড হলো আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ড, প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি তৃতীয় এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট এমএফ ১: স্কিম ১ এবং ফনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট ফান্ড।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সাতটি ফান্ডই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি মুনাফা করেছে। অর্থাৎ হিসাবের দিক থেকে এসব ফান্ড লোকসানে ছিল না। তারপরও মুনাফার বিপরীতে ইউনিটহোল্ডারদের কোনো নগদ লভ্যাংশ না দেওয়ায় বিষয়টি পুঁজিবাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ১২ পয়সা মুনাফা করেছে। একই বছরের ৩০ জুন শেষে বাজারদরে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ৩৪ পয়সা। তবে মুনাফা করার পরও ফান্ডটির ট্রাস্টি ইউনিটহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি।
এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ডের ইউনিটপ্রতি মুনাফা হয়েছে ৯০ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য ছিল ১০ টাকা। অর্থাৎ ফান্ডটির আর্থিক হিসাবে মুনাফা থাকলেও ওই মুনাফা থেকে ইউনিটহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচুয়াল ফান্ডও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ১৭ পয়সা। ৩০ জুন শেষে ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৭৯ পয়সা। তবে মুনাফা সত্ত্বেও ইউনিটহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা আসেনি।
আইসিবি তৃতীয় এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ৪০ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য ছিল ৮ টাকা ৬৬ পয়সা। এই ফান্ডের ট্রাস্টিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুনাফার বিপরীতে কোনো নগদ লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় মিউচুয়াল ফান্ড ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৪৭ পয়সা মুনাফা করেছে। একই সময়ে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ৫৫ পয়সা। কিন্তু মুনাফা করার পরও ইউনিটহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি।
আইসিবি এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট এমএফ ১: স্কিম ১-এর ইউনিটপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ১২ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য ছিল ৮ টাকা ৫০ পয়সা। এই ফান্ডটিও ইউনিটহোল্ডারদের কোনো নগদ লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
লভ্যাংশ না দেওয়া সাত ফান্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ ইউনিটপ্রতি মুনাফা করেছে ফনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট ফান্ড। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ৬৪ পয়সা। ৩০ জুন শেষে ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৮৪ পয়সা। তবে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করা সত্ত্বেও ফান্ডটি ইউনিটহোল্ডারদের কোনো নগদ লভ্যাংশ দিচ্ছে না।
অন্যদিকে একই সময়ে নয়টি ফান্ডের মধ্যে দুটি ফান্ড ইউনিটহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ৩৫ পয়সা। ৩০ জুন শেষে ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ১২ টাকা ৪৮ পয়সা। আর রিলায়েন্স ওয়ান দ্য ফার্স্ট স্কিম অব রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ১৫ পয়সা। ৩০ জুন শেষে ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য ছিল ১১ টাকা ৬২ পয়সা।
এখানে দেখা যাচ্ছে, মুনাফা করলেই একটি মিউচুয়াল ফান্ডকে সেই মুনাফার পুরোটা বা নির্দিষ্ট অংশ নগদ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করতে হবে—এমন সরল সম্কর্ক নেই। ফান্ডের ট্রাস্টি বিভিন্ন আর্থিক ও বিনিয়োগগত বিষয় বিবেচনা করে লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে মুনাফা থাকা সত্ত্বেও সাতটি ফান্ডের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার বিষয়টি ইউনিটহোল্ডারদের জন্য স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দুটি বিষয়ের দিকে নজর রাখেন ফান্ডের সম্কদ মূল্য এবং বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় বা লভ্যাংশ। কোনো ফান্ড ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করলেও যদি সেই মুনাফার কোনো অংশ ইউনিটহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ না করা হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত নগদ আয় কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ফান্ডের মুনাফা কোথায় রাখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা বিনিয়োগ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে লভ্যাংশ না দিয়ে মুনাফা ফান্ডে রেখে দিলে ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগ বা সম্কদ ব্যবস্থাপনায় সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগও নেই। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ট্রাস্টির যুক্তি, ফান্ডের বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং ইউনিটহোল্ডারদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
নয়টি ফান্ডের আর্থিক তথ্যেও পার্থক্য রয়েছে। লভ্যাংশ না দেওয়া সাতটি ফান্ডের মধ্যে ইউনিটপ্রতি মুনাফা ৯০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৬৪ পয়সার মধ্যে। বিপরীতে লভ্যাংশ ঘোষণা করা দুটি ফান্ডের মুনাফা যথাক্রমে ১ টাকা ৩৫ পয়সা ও ১ টাকা ১৫ পয়সা। অর্থাৎ শুধু মুনাফার পরিমাণের ভিত্তিতে কোন ফান্ড লভ্যাংশ দেবে আর কোনটি দেবে না—এমন কোনো সরাসরি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।
সম্কদ মূল্যের দিক থেকেও লভ্যাংশ ঘোষণা করা দুটি ফান্ড তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য ১২ টাকা ৪৮ পয়সা এবং রিলায়েন্স ওয়ান দ্য ফার্স্ট স্কিম অব রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ডের ১১ টাকা ৬২ পয়সা। অন্যদিকে লভ্যাংশ না দেওয়া সাতটি ফান্ডের ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১০ টাকার মধ্যে।
তবে ইউনিটপ্রতি সম্কদ মূল্য এবং মুনাফার পাশাপাশি ফান্ডের নগদ অবস্থান, বিনিয়োগের ধরন, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা, পূর্ববর্তী বছরের লভ্যাংশ নীতি এবং পরিচালন ব্যয়ের মতো বিষয়ও লভ্যাংশ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শুধু ইউনিটপ্রতি মুনাফার অঙ্ক দেখে কোনো ফান্ডের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা সম্কর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, মুনাফা করা সাতটি ফান্ডের ট্রাস্টি কেন ইউনিটহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এসব মুনাফা কীভাবে ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে যেসব ফান্ডের ইউনিটপ্রতি মুনাফা এক টাকা বা তার বেশি, সেসব ফান্ডের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণ ইউনিটহোল্ডারদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে লভ্যাংশ ঘোষণার মাধ্যমে দুটি ফান্ড সরাসরি ইউনিটহোল্ডারদের নগদ রিটার্ন দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। এর মধ্যে রিলায়েন্স ওয়ান দ্য ফার্স্ট স্কিম অব রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ডের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড দিয়েছে ৪ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণায় মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। নয়টি ফান্ডের মধ্যে সাতটি মুনাফা করেও কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। বিপরীতে তুলনামূলক কম ইউনিটপ্রতি মুনাফা থাকা দুটি ফান্ড নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ফলে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সেই মুনাফা ইউনিটহোল্ডারদের জন্য কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।