ঘাটতি ও একাধিক বিও হিসাবের অনিয়ম
হাজী আহমেদ সিকিউরিটিজকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা
ছবি সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ সংরক্ষণে ঘাটতি, গ্রাহকের হিসাবে বেআইনিভাবে নগদ অর্থ উত্তোলন এবং একই ই-মেইল, মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে একাধিক বিও হিসাব খোলার মতো একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এসব অনিয়মের দায়ে পুঁজিবাজারের সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেডকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
সম্ক্রতি কমিশনের নেওয়া এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদেশ ও পরিদর্শন নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ট্রেক নম্বর ৪১। কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএসইসির পরিদর্শন নথিতে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক তহবিল সংরক্ষণে দীর্ঘ সময় ধরে ঘাটতি ছিল। পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের প্রাপ্য অর্থ আলাদা হিসাবে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকদের অর্থের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট তহবিলে ঘাটতি থাকার কথা নয়। কিন্তু হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে এমন ঘাটতির তথ্য পেয়েছে বিএসইসি।
নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির দায় বা পাওনা ছিল ১১ কোটি ৩৫ লাখ ৫ হাজার ৭০১ টাকা। বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে জমা ছিল ৯ কোটি ২৫ লাখ ৫৫ হাজার ১৮ টাকা। ফলে ওই দিন গ্রাহকদের অর্থের বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার ৬৮২ টাকা।
তবে এই ঘাটতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পরিদর্শনেও গ্রাহক তহবিলে একাধিকবার ঘাটতি শনাক্ত করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের অর্থ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অনিয়মের বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে আসে।
বিএসইসির সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুঁজিবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক শর্ত। কারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার কেনাবেচা ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের জন্য ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন। গ্রাহকদের অর্থের বিপরীতে ঘাটতি তৈরি হলে তা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও বাজারের আস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গ্রাহক তহবিলে ঘাটতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি নগদ অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, গ্রাহকদের অর্থ লেনদেন নির্ধারিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্কন্ন করার কথা। এর মধ্যে অ্যাকাউন্ট পে চেক, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার, আরটিজিএস কিংবা ইলেকট্রনিক ফান্ড স্থানান্তরের মতো অনুমোদিত পদ্ধতি রয়েছে। সরাসরি নগদ অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে গ্রাহকের হিসাব পরিচালনার সুযোগ নেই।
কিন্তু বিএসইসির পরিদর্শনে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৬ জুন থেকে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজ সিটি ব্যাংকের একটি হিসাবের মাধ্যমে চেক ব্যবহার করে নগদ অর্থ উত্তোলন করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনায় এ ধরনের নগদ উত্তোলন নির্ধারিত বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির বিও হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বিএসইসি। কমিশনের ২০১৯ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন বিনিয়োগকারীর বিও হিসাবের সঙ্গে তার নিজস্ব ই-মেইল ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংযুক্ত থাকার কথা। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর পরিচয়, হিসাব পরিচালনা এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে একই ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করে একাধিক বিও হিসাব খোলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিএসইসির পরিদর্শনে এমন ৪০টি ই-মেইল ঠিকানা শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির বিপরীতে তিনটি থেকে সর্বোচ্চ ১৬টি পর্যন্ত বিও হিসাব খোলা হয়েছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে একটি ই-মেইল ঠিকানার বিপরীতে ১৬টি বিও হিসাব পরিচালনার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে একাধিক বিও হিসাবের সঙ্গে একই ব্যাংক হিসাব নম্বর সংযুক্ত থাকার তথ্যও পেয়েছে কমিশন।
নথি অনুযায়ী, এমন ২৪টি ব্যাংক হিসাব শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির সঙ্গে তিন থেকে পাঁচটি পর্যন্ত বিও হিসাব যুক্ত ছিল। একই মোবাইল নম্বরও একাধিক বিনিয়োগকারীর বিও হিসাবের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে বলে পরিদর্শনে উঠে এসেছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর বিও হিসাবের সঙ্গে নিজস্ব পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য সংযুক্ত রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত বিনিয়োগকারীকে শনাক্ত করা এবং হিসাব পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই ই-মেইল, মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে একাধিক বিও হিসাব পরিচালিত হলে প্রকৃত হিসাবধারী শনাক্তকরণ এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে একাধিক বিও হিসাবের ক্ষেত্রে একই ধরনের যোগাযোগ ও ব্যাংকিং তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুঁজিবাজারে অনিয়ম, সন্দেহজনক লেনদেন কিংবা বিনিয়োগকারীর পরিচয় গোপনের মতো কর্মকাণ্ড ঠেকাতে প্রতিটি বিও হিসাবের তথ্য সঠিক ও স্বতন্ত্র হওয়া প্রয়োজন।
এসব অনিয়মের বিষয়ে হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল বিএসইসি। প্রতিষ্ঠানটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়। তবে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি কমিশন। এরপর সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে জরিমানার সিদ্ধান্ত নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে পে-অর্ডারের মাধ্যমে এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা এবং বিও হিসাবের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেকাংশেই নির্ভর করে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।
তাদের মতে, গ্রাহক তহবিলে ঘাটতি, অনুমোদিত পদ্ধতির বাইরে নগদ অর্থ উত্তোলন এবং একই পরিচিতি ব্যবহার করে একাধিক বিও হিসাব খোলার মতো অনিয়মকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এসব বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর প্রয়োগ বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রাহকদের অর্থ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্রতিটি বিও হিসাবের সঙ্গে সঠিক ও স্বতন্ত্র বিনিয়োগকারী তথ্য রাখা বাধ্যতামূলক। এসব ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে কমিশন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। গ্রাহক তহবিলে ঘাটতি, অনুমোদিত পদ্ধতির বাইরে অর্থ উত্তোলন কিংবা একই তথ্য ব্যবহার করে একাধিক বিও হিসাব পরিচালনার মতো বিষয় পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্কর্কিত। তাই এ ধরনের অনিয়মকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কাছে বিনিয়োগকারীদের অর্থ একটি আমানতসদৃশ দায়িত্বের বিষয়। সেখানে ঘাটতি পাওয়া গেলে বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। একইভাবে একই ই-মেইল, মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে একাধিক বিও হিসাব খোলার বিষয়টিও বাজারের স্বচ্ছতার জন্য উদ্বেগজনক। এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। শুধু জরিমানা নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম যাতে আবার না ঘটে, সেজন্য নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে বিএসইসির এ সিদ্ধান্তে আরও একবার স্কষ্ট হলো, পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও হিসাব পরিচালনায় সামান্য অনিয়মও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজর এড়াচ্ছে না। তবে জরিমানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম যাতে আবার না ঘটে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।