সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ২২:৫৫, ৭ আগস্ট ২০২৬

অনিয়মের ভারে দিশাহারা ন্যাশনাল টি কোম্পানি

অনিয়মের ভারে দিশাহারা ন্যাশনাল টি কোম্পানি

ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা, বিপুল ঋণের বোঝা এবং টানা লোকসানে রাষ্ট্রায়ত্ত ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) গভীর সংকটে পড়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোম্পানিটির ক্রয় প্রক্রিয়া, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বাড়ছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন মালামাল ক্রয় করা হয়েছে। চা বাগানের শ্রমিকদের আবাসন সংস্কারের জন্য সিআই শিট ও টালি কেনার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত টেন্ডার ও সরকারি ক্রয়নীতির অনুসরণ করা হয়নি। কাগজপত্রে মালামাল ক্রয়ের তথ্য থাকলেও সরেজমিনে তার ঘাটতি পাওয়া গেছে। এছাড়া কেন্দ ীয় গুদামে সংরক্ষিত বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্যের মজুতেও উল্লেখযোগ্য অসংগতি ধরা পড়ে।

২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানির মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৪৪ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে। একই সময়ে নেগেটিভ ইক্যুইটি বেড়ে ৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে এ সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য কার্যকর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়নি।

২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত শেয়ারধারণ ৫১ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় কোম্পানিটি আর সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেই। এ অবস্থায় অতীতে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে কোম্পানিটি ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করতে পারেনি। একই সঙ্গে টানা দুই বছর আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ব্যাখ্যা চাইলেও কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।

আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্বের বিষয়ে কোম্পানির সচিব এ কে আজাদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

জানা গেছে, কোম্পানির ১৬টি চা বাগানের মধ্যে বর্তমানে ১২টি চালু রয়েছে। তবে অধিকাংশ বাগানের বয়স ১০০ বছরের বেশি হওয়ায় উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। চালু থাকা ১২টি বাগানের মধ্যে আটটিই লোকসানে রয়েছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছর ধরেই লোকসানে রয়েছে ন্যাশনাল টি। ২০২১ সালে কোম্পানির লোকসান ছিল ২০ কোটি ৯১ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৬৩ কোটি ৫১ লাখ টাকায় পৌঁছায়। বর্তমানে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারের ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে রয়েছে।

শেয়ারদরেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল ৪২০ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল ১৬০ টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ প্রায় এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারদর কমেছে ৬১ দশমিক ২৩ শতাংশ। বর্তমানে প্রতিটি শেয়ারের বাজারদর ১৬৮ টাকা ৩০ পয়সা।

নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, স্থায়ী সম্পদের মূল্যায়ন, অবচয় নির্ধারণ ও কৃষিজ সম্পদের হিসাবায়নে আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-১৬ ও আইএএস-৪১ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে সম্পদের প্রকৃত মূল্য এবং উৎপাদন তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রাইট শেয়ার ইস্যুতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

বিএসইসি ২৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার রাইট শেয়ারের অনুমোদন দিলেও চাঁদা সংগ্রহ সম্পন্ন হওয়ার আগেই এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর ৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার রাইট শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত ভঙ্গ করে সংগৃহীত অর্থের প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বিএসইসিতে জমা দেওয়া হয়নি।

নির্ধারিত সময়ে আর্থিক বিবরণী দাখিল না করায় কোম্পানিটিকে প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা দিতে হচ্ছে। এ জরিমানা মওকুফের আবেদনও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে কোম্পানির পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের উচ্চ সুদের ঋণের কারণে প্রতিবছর বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। দুই বছর ধরে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। এছাড়া করোনাকালে ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রভাবও এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানান, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে কমিশন তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে ন্যূনতম শেয়ার ধারণসংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়নেও কমিশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহম্মেদ খান জানান, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, ঋণ পুনর্গঠনের অগ্রগতি এবং পরিচালন মুনাফার উন্নতির স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকবে। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান নেওয়া উচিত। তিনি আরও জানান, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এনটিসির টিকে থাকা অনেকটাই নির্ভর করবে ঋণের চাপ কমানো এবং নেগেটিভ ইক্যুইটি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতার ওপর।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ন্যাশনাল টি কোম্পানির ছয় পরিচালক একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর দীর্ঘ সময় বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে ২০২২ সালের পর থেকে কোম্পানিটি আর কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২২ সালে শেয়ারহোল্ডারদের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম চা নিলাম কেন্দে র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৩১তম নিলামে এনটিসির ১২টি বাগানের প্রায় আড়াই লাখ কেজি চা বিক্রি করে ৬ কোটি ৬ লাখ টাকা আয় হয়, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে একক নিলামে সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড। তবে দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ঘাটতি কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।