সাজেক বন্ধে ৫ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হারানোর শঙ্কা
সাজেক
নিরাপত্তার কারণে রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে পর্যটক ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। এতে পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পর্যটক পরিবহনের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় মানুষের আয়ের পথেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে আগামী ১০ দিনে শুধু রুম ভাড়া ও পর্যটক পরিবহন খাতেই প্রায় ৪ কোটি ৫১ লাখ টাকার ব্যবসা হারাতে পারে সাজেক। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসার ক্ষতি যুক্ত হলে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়বে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সামনেই শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি। এরপর শুরু হবে শীতের পর্যটন মৌসুম। এ সময় সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজে পর্যটকদের আগাম বুকিং থাকে। কিন্তু হঠাৎ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় সেই বুকিং বাতিল, অগ্রিম টাকা ফেরত এবং কর্মীদের বেতনসহ পরিচালন ব্যয় মেটানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি এসোসিয়েশনের ডাকা সড়ক অবরোধের কারণে সাজেকগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আটকে পড়েন বহু পর্যটক। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নিলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত পড়েছে সাজেকের পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে।
১০ দিনে পরিবহনেই ক্ষতি ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা
সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছোট-বড় মিলিয়ে সেখানে প্রায় ১৩৫টি রিসোর্ট এবং শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০টি গাড়ি সাজেকে আসা-যাওয়া করে। প্রতিটি গাড়ির গড় ভাড়া প্রায় ১৩ হাজার টাকা।
এই হিসাবে প্রতিদিন পর্যটক পরিবহন খাতে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ লাখ টাকা। নিষেধাজ্ঞা ১০ দিন স্থায়ী হলে এ খাতে সম্ভাব্য ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। পর্যটক পরিবহন বন্ধ থাকলে এই আয়ের বড় অংশ থেকেই বঞ্চিত হবেন গাড়ির মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা।
সাজেক গাড়ির লাইনম্যান ইয়াছিন আরাফাত বলেন, সাধারণত শুক্র ও শনিবার বাদে অন্যান্য দিনে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি গাড়ি সাজেকে প্রবেশ করে। শনিবার রাতেও ৫৮টি গাড়িতে প্রায় ৫০০ পর্যটক এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক বন্ধ ঘোষণায় গাড়িচালক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যবসার এমন সময়ে কেউ এ ধরনের পরিস্থিতি চান না।
রুম ভাড়াতেই সম্ভাব্য ক্ষতি ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা
পরিবহনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে আবাসন খাতে। রিসোর্ট মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, সাজেকের ১৩৫টি রিসোর্টে প্রায় ৬৭৫টি কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষের ভাড়া থেকে প্রতিদিন ন্যূনতম প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় হওয়ার হিসাব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সে হিসাবে ১০ দিনে রুম ভাড়া বাবদ সম্ভাব্য আয় দাঁড়ায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পর্যটক না থাকলে এই আয়ের সুযোগ হারাবেন রিসোর্ট ও কটেজের মালিকেরা। এর বাইরে কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ, জেনারেটরের জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বহন করতে হবে তাঁদের।
অবকাশ রিসোর্টের ম্যানেজার নাজিম উদ্দিন বলেন, আগামী ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজ আগেই বুকিং করা হয়েছিল। বিশেষ করে দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে ১৯ অক্টোবর থেকে শতভাগ বুকিং ছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্ধের সিদ্ধান্তে এখন অগ্রিম বুকিং বাতিল করে টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই এই ক্ষতির ধাক্কা সামলে ওঠা অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে কঠিন হবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শ্রমজীবীদের আয়ও বন্ধের শঙ্কা
সাজেকের পর্যটন অর্থনীতি শুধু রিসোর্ট ও পরিবহননির্ভর নয়। পর্যটকদের খাবার সরবরাহকারী রেস্তোরাঁ, স্থানীয় দোকান, হস্তশিল্প বিক্রেতা, বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবায় যুক্ত শ্রমিকদের আয়ও পর্যটকদের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
পর্যটক কমে গেলে এসব ব্যবসায় বিক্রি কমে যায়। আর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ হলে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত করা কিংবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে দৈনিক মজুরিতে কাজ করা শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্মীদের সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেকের ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটকদের আনাগোনা কমে গেলে একজন রিসোর্ট মালিকের ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের সরবরাহকারী, কৃষিপণ্য বিক্রেতা, খাবারের দোকান এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট বহু মানুষের আয় কমে যায়। ফলে নিষেধাজ্ঞার আর্থিক প্রভাব একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ছড়িয়ে পড়বে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে।
দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি
সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যে সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করবেন। তবে অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞায় সাজেকের পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য তাঁরা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি পর্যটননির্ভর মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত পর্যটন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বুকিং বাতিল, কর্মীদের বেতন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ব্যয় সামাল দিতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি তাঁদের।
সাজেকের পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের আয়-রোজগার। তাই নিষেধাজ্ঞা কত দিন স্থায়ী হবে, নিরাপদে পর্যটন কার্যক্রম কবে চালু হবে—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত স্বাভাবিক হবে পর্যটন কার্যক্রম, সচল হবে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ফিরবে স্থানীয় মানুষের আয়ের পথ।