মাটির প্রতিমায় ফুটে উঠছে দুর্গা উত্সবের অপেক্ষা
মাটির প্রতিমায় ফুটে উঠছে দুর্গা উত্সবের অপেক্ষা
নারায়ণগঞ্জের কোনো এক মণ্ডপে তখন শিল্পীর হাতে তুলি। সামনে সারি করে রাখা দেব-দেবীর প্রতিমা। দুর্গার মুখে রং বসছে ধীরে ধীরে। চোখের কাজ এখনও বাকি। কোথাও আবার প্রতিমার শাড়ি, অলংকার ও চুল সাজানোর প্রস্তুতি চলছে। মাটির গন্ধ, রঙের গন্ধ আর কারিগরদের ব্যস্ততায় বদলে গেছে মণ্ডপের পরিবেশ। মহালয়া আসার আগেই যেন সেখানে শুরু হয়ে গেছে উত্সবের কাউন্টডাউন।
শুধু একটি প্রতিমা তৈরি নয়, শিল্পীদের কাছে এটি কয়েক দিনের এক নিবিড় সাধনা। খড়ের কাঠামো তৈরি থেকে মাটির প্রলেপ, শুকানো, মসৃণ করা, রং করা এবং শেষ পর্যন্ত অলংকার ও পোশাকে সাজানো—প্রতিটি ধাপেই সময় ও যত্নের প্রয়োজন। সেই কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। শিল্পীরা একেকটি প্রতিমার মুখাবয়ব, চোখ, চুল ও পোশাকের খুঁটিনাটি ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত।
১০ অক্টোবর মহালয়া। সেদিন পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। এরপর ১৭ অক্টোবর ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোত্সব। নারায়ণগঞ্জে এ উত্সবকে ঘিরে এখন মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
প্রতিমার সাজে ব্যস্ত শিল্পীরা : প্রতিমা তৈরির কাজ সাধারণত কয়েক ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে বাঁশ ও খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর তাতে মাটি লাগানো হয়। মাটি শুকানোর পর দেওয়া হয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রলেপ। কাঠামোর আকৃতি ঠিক হলে শুরু হয় মসৃণ করার কাজ। সবশেষে রং, চুল, পোশাক ও অলংকার দিয়ে প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়।
এবার নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা শিল্পীদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ছে। শিল্পীদের কেউ মুখের অবয়ব ঠিক করছেন, কেউ রঙের কাজ করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত প্রতিমার পোশাক ও সাজসজ্জা নিয়ে। পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় অনেক মণ্ডপেই দিন-রাত কাজ চলছে।
একজন শিল্পীর কাছে প্রতিমার চোখ আঁকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চোখ আঁকার পরই প্রতিমার মুখে যেন প্রাণের ছাপ ফুটে ওঠে। তাই এই কাজটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করেন শিল্পীরা। মণ্ডপের ব্যস্ততার মধ্যেও চোখ আঁকার সময় তাদের মনোযোগ থাকে পুরোপুরি প্রতিমার মুখের দিকে।
২৪০ মণ্ডপে উত্সব: জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে এবার ২৪০টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। মণ্ডপের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। প্রশাসনের হিসাবে সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকাসহ প্রায় ৭৯টি, রূপগঞ্জে প্রায় ৫৭টি, আড়াইহাজারে ৪০টি, সোনারগাঁয়ে ৩৫টি এবং বন্দর উপজেলায় প্রায় ২৯টি মণ্ডপ রয়েছে। মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রস্তুতির পরিধিও। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি মণ্ডপ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, বিদ্যুত্, সিসিটিভি, স্বেচ্ছাসেবক এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমা তৈরির জায়গা থেকেই নিরাপত্তা : দুর্গাপূজার নিরাপত্তাকে শুধু পূজার কয়েকটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না পুলিশ। প্রতিমা তৈরির শুরু থেকেই নজরদারি রাখা হচ্ছে। প্রতিমা মণ্ডপে নেওয়ার সময়ও মোবাইল টিমের মাধ্যমে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা পুলিশ জানিয়েছে, এবার ৭৫০ পুলিশ সদস্য পূজার নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের মধ্যে ইউনিফর্ম পরা পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্যরাও থাকবেন। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলো, স্বেচ্ছাসেবক ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চুরি, ছিনতাই, নারী ও শিশুদের হয়রানি এবং অন্যান্য অপরাধ ঠেকাতে বিশেষ টহল ও মোবাইল টিম কাজ করবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো ঠেকাতেও নজরদারি থাকবে।
উত্সবের সঙ্গে সম্প্রীতির বার্তা : নারায়ণগঞ্জ শিল্পনগরী। এই জেলার শহর ও গ্রামজুড়ে নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। দুর্গাপূজা তাই শুধু পূজামণ্ডপের ভেতরের আয়োজন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এলাকার সামাজিক জীবনও। পূজার সময় মণ্ডপে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় হয়। অনেকে প্রতিমা দেখতে বের হন পরিবার নিয়ে। দোকানপাট, সড়ক ও বাজারেও বাড়ে মানুষের উপস্থিতি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাই নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে হবে।
পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানও বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পূজারি ও দর্শনার্থীরা যাতে আনন্দমুখর পরিবেশে উত্সব উদ্যাপন করতে পারেন, সেটিই পুলিশের লক্ষ্য।
মণ্ডপে মণ্ডপে এখন শেষ প্রস্তুতি: মহালয়া ঘনিয়ে আসায় মণ্ডপগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। কোথাও প্যান্ডেলের শেষ কাজ, কোথাও আলোকসজ্জার প্রস্তুতি, আবার কোথাও প্রতিমার সাজসজ্জা চলছে। শিল্পীরা তাদের কাজ শেষ করার সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছেন।
মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপনের পর শুরু হবে সাজসজ্জার শেষ ধাপ। দেবীর শাড়ি, অলংকার, অস্ত্র, মুকুট—সবকিছু মিলিয়ে তখন সম্পূর্ণ হবে প্রতিমার রূপ। মণ্ডপের আলো জ্বলে উঠলে বদলে যাবে পুরো দৃশ্যপট।
এখনও অবশ্য সেই পূর্ণ সাজের অপেক্ষা। কিন্তু মাটির প্রতিমায় দুর্গার মুখ ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই অপেক্ষাও আর দীর্ঘ মনে হচ্ছে না। মহালয়ার আগে শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে নারায়ণগঞ্জের মণ্ডপগুলোয় ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে শরতের উত্সবের বার্তা।
একদিকে শিল্পীর হাতে শেষ মুহূর্তের রং-তুলি, অন্যদিকে প্রশাসনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে শারদীয় দুর্গোত্সবের আবহ তৈরি হচ্ছে ধীরে ধীরে। মহালয়ার দিন দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে সেই আবহ আরও দৃশ্যমান হবে। এরপর ষষ্ঠীর অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষার শেষে পাঁচ দিনের পূজার আনন্দে মুখর হবে জেলার ২৪০টি মণ্ডপ।