মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 

প্রকাশ: ২৩:৩৮, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বড় সরদার বাড়ির মেরামত স্থগিত ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি 

বড় সরদার বাড়ির মেরামত স্থগিত ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি 

ছবি সংগৃহীত

সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী বড় সরদার বাড়ি। বারো ভুঁইয়ার সময় থেকে ঔপনিবেশিক আমলের সাক্ষ্য বহনকারী এই স্থাপনাটির সংরক্ষণ নিয়ে চলছে রশি টানাটানি। সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের সীমানায় অবস্থিত বিখ্যাত এ বাড়িটি মুসলিম স্থাপনায় ঔপনিবেশিক শাসনামলের আবাসিক ভবনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মসলিন-খ্যাত বাংলার ঐতিহ্যবাহী রাজধানী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ির কাঠামোগত ও সংরক্ষণগত মূল্যায়ন ছাড়াই দেয়ালের ক্ষতচিহ্ন মেরামতের কাজ শুরুর অভিযোগ উঠেছে। সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি এ অভিযোগ তুলে অবিলম্বে মেরামত কাজ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক বিশেষজ্ঞ প্রত্নতাত্ত্বিকের তত্ত্বাবধানে এ সংস্কারকাজ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির অভিযোগ, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক তা অনুসরণ করেননি। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে বড় সরদার বাড়ির দেয়ালের ক্ষতচিহ্ন মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। পুরোনো গাঁথুনি, কাঠের সংযোগস্থল ও ভারবহনকারী অংশের অবস্থা পরীক্ষা না করেই সাধারণ ভবনের মতো মেরামত করা হচ্ছে বলে দাবি সংগঠনটির।
এদিকে বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের আগে সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়িতে লোকশিল্প জাদুঘরের চলমান মেরামত কার্যক্রম স্থগিত এবং প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের ২১ লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও বিশিষ্ট নাগরিক। গত সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, সমপ্রতি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়িটি শুটিংয়ের জন্য ভাড়া দেওয়ায় স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদের মুখে কর্তৃপক্ষ গত ২৯ সেপ্টেম্বর মেরামতকাজ শুরু করেছে। তবে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের কোনো ধরনের মূল্যায়ন ছাড়াই মেরামত কার্যক্রম শুরু করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিবৃতিদাতারা।
তারা অবিলম্বে চলমান মেরামত কার্যক্রম স্থগিত করে স্থাপনাটির পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত ও সংরক্ষণগত মূল্যায়নের দাবি জানান। ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি’র অভিযোগের বরাত দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর চার দিনের শুটিংয়ে উচ্চক্ষমতার জেনারেটর, ক্রেন, ট্রলি, ভারী ক্যামেরা, এসি, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম ব্যবহারের পর বড় সরদার বাড়ির দেয়াল ও কারুকাজে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিবৃতিদাতারা বলেন, এসব সরঞ্জামের কম্পন, তাপ ও চাপ ঐতিহাসিক স্থাপনাটির কী পরিমাণ ক্ষতি করেছে, তা বিশেষজ্ঞ সমীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পরবর্তী মেরামত ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। এ বিষয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপও কামনা করেন তারা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন লেখক, চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ, শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, কবি ও মানবাধিকারকর্মী শাহেদ কায়েস, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ভবানী শংকর রায়, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল, পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি ও কবি রহমান মুজিব, চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক অমল আকাশ, কবি কাজল কানন, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি রীনা আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা লক্ষ্মী চক্রবর্তী, উন্মেষ সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি প্রদীপ ঘোষ বাবু, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক দিনা তাজরীন, কবি পলল পরাগ, সাংবাদিক আফসার বিপুল, শিক্ষক কৃতি কণিকা, শিল্পী অমিতাভ চক্রবর্তী, কবি ও শিল্পী আহমেদ বাবলু এবং সাংবাদিক রহমান সিদ্দিক।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির নেতারা বলেন, বড় সরদার বাড়িতে কোক স্টুডিও বাংলা সিজন-৪-এর শুটিংয়ের পর দেয়াল, অলংকরণ ও নকশার বিভিন্ন অংশে ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। চার দিনের শুটিংয়ে উচ্চ ক্ষমতার জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব সরঞ্জামের কম্পন ও চাপ স্থাপনাটির কাঠামোর ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণে কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিটি।
কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহেদ কায়েস বলেন, বড় সরদার বাড়ির মেরামতের আগে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে কাঠামোগত ও সংরক্ষণগত মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছিলাম। পরিচালক প্রতিশ্রুতি দিলেও মূল্যায়ন ছাড়াই দেয়াল মেরামত শুরু হয়েছে। ক্ষতচিহ্ন ঢাকলেই স্থাপনা নিরাপদ হবে না। গাঁথুনির ফাটল, কম্পনের প্রভাব, কাঠের সংযোগস্থলের দুর্বলতা ও ভারবহনকারী অংশের ক্ষতি আড়ালে থাকতে পারে। পরীক্ষা ছাড়া মেরামত করা হলে ক্ষতির আলামত চাপা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির পক্ষ থেকে প্রত্নস্থাপনা সংরক্ষণে অভিজ্ঞ স্থপতি, কাঠামো প্রকৌশলী, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন দল গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। ওই দলকে দিয়ে দেয়াল ও ছাদের গাঁথুনি, ফাটল, কাঠের সংযোগস্থল, আর্দ্রতা এবং ভারবহনকারী অংশ পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শুটিংয়ের আগে ও পরের অবস্থার তুলনামূলক কারিগরি মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এর আগে বড় সরদার বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি, বাণিজ্যিক ভাড়া এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবিতে গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কমিটি। একই দাবিতে ৩১ আগস্ট সোনারগাঁ জাদুঘরের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন করা হয়। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী, ইউনেস্কো এবং প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কাছে স্মারকলিপি দেয় সংগঠনটি।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম জানান, সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন। ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ি সংস্কার ও সংরক্ষণ প্রকল্পের পিডি বিশেষজ্ঞ প্রত্নতাত্তিক প্রফেসর আবু সাঈদের তত্ত্ববধানে এ সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। এর আগে ২০২১ সালে প্রথম দফায় সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে সরদার বাড়ির ছাদ ও ছোট খাটো ভাঙাগুলো এখন সংস্কার করা হচ্ছে।