সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরফান উল্লাহ, ইবি প্রতিনিধি:

প্রকাশ: ১৯:১৮, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বদলে ‘আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ভর্তি, প্রথমবারেই বিজেএস জয়

ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বদলে ‘আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ভর্তি, প্রথমবারেই বিজেএস জয়

রাজু আহমেদ

ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ বদলে যায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ভর্তির পর। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল-ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন রাজু আহমেদ। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ধীরে ধীরে আইনের প্রতি তৈরি হয় ভালোবাসা, সেখান থেকেই জন্ম নেয় বিচারক হওয়ার নতুন স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করেন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি। প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক বাবার স্বপ্ন, ফিকহ ও প্রচলিত আইনের ভিন্নধর্মী পড়াশোনার সঙ্গে জুডিশিয়ারির প্রস্তুতির সমন্বয় এবং মাস্টার্স শেষ হওয়ার আগেই প্রথমবারের বিজেএসে ২৬তম মেধাক্রম। রাজু আহমেদের এই পথচলার নানা দিক নিয়ে শেয়ারবিজের ইবি প্রতিনিধি ইরফান উল্লাহ রাফসানজানির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন তিনি—


প্রশ্ন: আপনার নিজের সম্পর্কে বলুন

—আমার জন্ম চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার একটি অজপাড়া গ্রামে। সেখানে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগও খুব বেশি ছিল না। আমার বাবা একজন দরিদ্র কৃষক। তিনি নিজে লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও তাঁর একটাই স্বপ্ন ছিল—ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তোলা। দীর্ঘ ৩০ বছর বাবা একাই সংসারের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছোটবেলায় তাঁকে লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে যেতে দেখেছি। কিন্তু কখনো আমাকে কৃষিকাজে সাহায্য করতে বলেননি। এমনকি নিজের ইচ্ছায় মাঠে যেতে চাইলেও বাধা দিয়েছেন। শুধু বলতেন, ‘স্কুলে যাও’

গ্রামের স্কুল থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করেছি। ২০১৭ সালে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সেই ছোট্ট গ্রাম ছেড়ে বের হয়েছিলাম। চোখে ছিল অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন, আর পেছনে ছিল বাবার সেই একটি কথা—‘পড়াশোনা করো।’ কায়েতপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে ৪.৯৫ এবং আব্দুর রউফ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে ৪.৭৫ জিপিএ পেয়েছি।

প্রশ্ন: মাস্টার্স শেষ হওয়ার আগেই বিজেএসে ২৬তম হয়ে বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। খবরটি পাওয়ার মুহূর্তের অনুভূতি কেমন ছিল? আর বিচারক হওয়ার স্বপ্ন কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

—আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া, তিনি আমাকে বিচারক হিসেবে সম্মানিত করেছেন। রেজাল্ট দেখার পরও বিশ্বাস হচ্ছিল না যে রোলটি আমার। প্রায় ৯-১০ জনকে বলেছি, ‘আমার রোলটা একটু মিলিয়ে দেখো।’ তারপরও এখনো যেন বিশ্বাস হচ্ছে না আমি সত্যিই বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। এই অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ভর্তি হই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ধীরে ধীরে আইনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। সেখান থেকেই মনে একটি লক্ষ্য তৈরি হয়—আমাকে বিচারক হতেই হবে। এরপর একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিচারক হওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করি।

প্রশ্ন: আপনার মূল প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল থার্ড ইয়ার থেকে। তুলনামূলকভাবে দেরিতে শুরু করেও এই সাফল্য—প্রস্তুতির ধরন ও কৌশলটা কেমন ছিল?

—আমি সবসময় নির্দিষ্ট টার্গেট ঠিক করে পড়াশোনা করতাম। প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি। প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ‘বেয়ার অ্যাক্ট’কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কমেন্টারি ও রেফারেন্স বই পড়েছি। আমার কাছে মূল বিষয় ছিল, আইনকে শুধু মুখস্থ না করে বুঝে পড়া।

প্রশ্ন: প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভার প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছেন?

—প্রিলিমিনারির প্রস্তুতির শুরুতে মূল আইনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো ভালোভাবে বুঝে পড়েছি। এরপর সেগুলো বারবার রিভিশন দিয়েছি। সাধারণ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বাছাই করে পড়তাম। পাশাপাশি নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা পড়েছি, যাতে সাম্প্রতিক বিষয়গুলো সম্পর্কে আপডেট থাকা যায়। প্রিলিমিনারির আগে বেশি বেশি পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কখনো কখনো দিনে ৫–৬টি পরীক্ষাও দিয়েছি। নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে নিজের প্রস্তুতি যাচাই ও ভুলগুলো সংশোধন করেছি।

লিখিত পরীক্ষার জন্য মূল আইনগুলোকে ভিত্তি করে নিজের তৈরি করা হ্যান্ডনোট বারবার রিভিশন দিয়েছি। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য বড় বড় কমেন্টারি ও রেফারেন্স বই পড়েছি।

ভাইভার জন্য আলাদা করে কোনো বিশেষ প্রস্তুতি নিইনি। প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় তৈরি করা নোটগুলোই বারবার রিভিশন করেছি। পাশাপাশি নিজের একাডেমিক বিষয় ও আইন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগে অর্ধেক পড়াশোনা ফিকহ ও অর্ধেক প্রচলিত আইন। জুডিশিয়ারিতে ফিকহের বিষয় সরাসরি না থাকলেও বিভাগীয় পড়াশোনার অংশ হিসেবে তা করতে হয়েছে। এই পড়াশোনার পাশাপাশি জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি কীভাবে সমন্বয় করেছেন? ফিকহের পড়াশোনা কি কোনো সুবিধা দিয়েছে?

—একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি নেওয়াটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমি সবসময় একাডেমিক পড়াশোনার সঙ্গে জুডিশিয়ারির প্রস্তুতিকে সমন্বয় করে পড়ার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: একাডেমিক পড়াশোনা, ফিকহের পড়া, ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততার পাশাপাশি প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কী ছিল?

—একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি নেওয়া চ্যালেঞ্জিং ছিল। মাঝেমধ্যে হতাশা এসেছে। তবে সেসব সময়ে সৃষ্টিকর্তার কথা স্মরণ করেছি এবং নিজের লক্ষ্যের দিকে আবার মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার বিভাগে অনেক সেশনজট ছিল। বিষয়টি দেখে অনেকেই হতাশ হতো। কিন্তু আমি এটাকে হতাশার কারণ হিসেবে না দেখে সুযোগ হিসেবে দেখেছি। যেহেতু আমার হাতে তুলনামূলক বেশি সময় ছিল, তাই সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে আইনের প্রতিটি বিষয় বিস্তারিতভাবে পড়ার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়—এটাই আমার যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

প্রশ্ন: দেশের আইন শিক্ষার মধ্যে আপনার আল ফিকহ্ অ্যান্ড ল বিভাগের একাডেমিক কাঠামো বেশ আলাদা। বিভাগের বিশেষায়িত পরিচয়ের কারণে কখনো কোনো বৈষম্য, জটিলতা বা বাড়তি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন কি?

—না, এমন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হইনি। এমনকি ভাইভাতেও আমার বিভাগ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি।

প্রশ্ন: আপনার নিজের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা থেকে এমন কোনো শিক্ষা বা ভুলের কথা বলবেন, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই মাথায় রাখলে উপকৃত হবে?

—আমার মনে হয়, প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিভাগের সেশনজটকে হতাশার কারণ হিসেবে না দেখে নিজের প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে নিয়েছি। হাতে থাকা সময় কাজে লাগিয়ে আইনের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে পড়েছি এবং শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, আইনকে বোঝার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: আপনার এই সাফল্যের পর বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি নিতে আগ্রহী হবে। যারা মনে করেন, ফিকহের অতিরিক্ত পড়াশোনার কারণে তারা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন—তাদের কী পরামর্শ দেবেন?

—বিভাগ নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার কোনো কারণ নেই। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। প্রথমবারেই বিচারক হতে চাইলে দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই একাডেমিক পড়াশোনার সঙ্গে বিজিএসের প্রস্তুতি সমন্বয় করে শুরু করা উচিত। জুডিশিয়ারির সিলেবাস ডাউনলোড করে নিজের একাডেমিক সিলেবাসের সঙ্গে ক্রসচেক করতে হবে। এতে একই বিষয় একাডেমিক ও বিজিএস দুই দিক থেকেই প্রস্তুত হয়ে যাবে। পাশাপাশি নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করতে হবে এবং মূল আইনগুলো ভালোভাবে বুঝে পড়তে হবে। শুরুটা যত আগে হবে, প্রস্তুতিটা তত বেশি গভীর ও গোছানো হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শর্টকাট পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জুডিশিয়ারির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আইনগুলো বিস্তারিতভাবে পড়তে হবে এবং বেয়ার অ্যাক্টকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের বিভাগের পড়াশোনাকে দুর্বলতা না ভেবে সেটিকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

প্রশ্ন: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

—ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অসহায় ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। একজন বিচারক হিসেবে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করাই আমার মূল লক্ষ্য।