মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২:৫০, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোংলা বন্দরকে ‘স্মার্ট’ বন্দরে রূপান্তরের পরিকল্পনা

মোংলা বন্দরকে ‘স্মার্ট’ বন্দরে রূপান্তরের পরিকল্পনা

ছবি সংগৃহীত

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেছেন, আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন উন্নয়নের মাধ্যমে মোংলা বন্দরকে একটি ‘স্মার্ট’ বন্দরে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো হচ্ছে, পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিং, আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট, বন্দর চ্যানেলে সংরক্ষণ ড্রেজিং, বন্দরের দুটি অসম্পূর্ণ যেটি পিপিপি মডেল অনুসরণ নির্মাণ, আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা, সহায়ক জলযান সংগ্রহ, বন্দরের সুবিধা সমপ্রসারণ ও উন্নয়নসহ ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ এবং সার্ভিস বৃদ্ধি। এ ছাড়া বন্দরের উন্নয়নে ২০২৭ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে মোংলা বন্দর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনার খালিশপুরের পোর্ট অডিটোরিয়ামে খুলনাস্থ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি চাহিদা পূরণে মোংলা বন্দরের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যেও বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য অবকাঠামো, যোগাযোগ ও নৌপথের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বন্দর আধুনিকায়নে নতুন প্রকল্প গ্রহণের তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, এর আওতায় দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। থাকবে ডেঞ্জারাস কার্গো ইয়ার্ড ও আধুনিক হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম। পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে বন্দরকে স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

মবক চেয়ারম্যান জানান, রামপাল থেকে আলট্রা সুপার পাওয়ার প্ল্যান্ট পর্যন্ত পশুর চ্যানেল ড্রেজিংয়ে একটি প্রকল্প চলমান। পাশাপাশি বয়া লেইং ভেসেল, সার্ভে ভেসেল, ফায়ার ফাইটিং ভেসেল ও পাইলট মাদার ভেসেল সংগ্রহের কাজ চলছে।

ড্রেজিং ব্যয় কমাতে নদীশাসনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব সরকারের কাছে দেয়া হয়েছে। জয়মনিরঘোলে টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে পলি জমার প্রবণতাপ্রবণ এলাকায় ড্রেজিংয়ের চাপ কমতে পারে। মোংলা বন্দরের রেললাইন পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইন সমপ্রসারণ করা গেলে পণ্য সরাসরি পরিবহনের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি ঢাকা-মোংলা চার লেন সড়ক এবং খুলনা অঞ্চলে বিমানবন্দর নির্মাণ হলে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ আরও বাড়বে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা সহজ করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু রয়েছে বলে জানিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, অধিকাংশ সেবা ও পেমেন্ট অনলাইনে আনা হয়েছে। ই-পেপার সার্ভিসের কাজও শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে সর্বমোট ৮১৫টি জাহাজ আগমন করেছে। এ সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন থাকলেও তা অতিক্রম করে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং সম্পন্ন হয়। এটি পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বা ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বেশি।

একই অর্থবছরে ২৫ হাজার টিইইউজ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মোট ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউজ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউজ (৩৮.৪৯ শতাংশ) বেশি। এছাড়া রিকনডিশন্ড গাড়ি আমদানিতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ বছরে মোট ১২ হাজার ৭৫ ইউনিট গাড়ি আমদানি করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।

পরিচালন কার্যক্রম বাড়ার পাশাপাশি বন্দরের রাজস্ব আয়েও বড় সাফল্য এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা রাজস্ব অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অর্জিত হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা (১১.৭৬ শতাংশ) বেশি।

বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, বর্তমানে মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচলে কোনো জট নেই এবং খালাসের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইমও বেশ উন্নত। কনটেইনারবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে গড় অবস্থান সময় ১ দশমিক ৮০ দিন এবং অন্যান্য জাহাজের ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ৪৪ দিন। পাশাপাশি আধুনিক সুবিধার অংশ হিসেবে ১৪৪ কিলোমিটার বন্দর চ্যানেলে লাইটেড বয়া ও লাইট টাওয়ার স্থাপনের মাধ্যমে দিন-রাত নিরাপদে জাহাজ চলাচলের সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে।

নাব্যতা ধরে রাখাকে বন্দরের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে জেটির সামনে ৭ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিংয়ের সুবিধা রয়েছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে তা ৯ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত করার কাজ চলছে।

তিনি জানান, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতিও যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া মোংলা বন্দরের জন্য সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।

বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, নাব্যতা বাড়াতে পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং করা গেলে জেটি পর্যন্ত ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা সহজ করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু রয়েছে। পারমিশন, ইকুইপমেন্ট বুকিং ও বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। ই-পেপার সার্ভিসের কাজও শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিকল্প কর্মকর্তা) প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কমান্ডার এস এম আফজালুল ইসলাম, পরিচালক (বোর্ড) কালাচাঁদ সিংহ, হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. সালাহ্ উদ্দিন কবির, প্রোগ্রামার প্রকৌশলী সগীর আহমেদ, সহকারী ট্রাফিক ম্যানেজার মো. শামীম হাওলাদারসহ বন্দর কর্মকর্তাবৃন্দ এবং খুলনায় কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।