বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

আজাদুল ইসলাম, নোয়াখালী

প্রকাশ: ২০:০৬, ২২ আগস্ট ২০২৬

পোনা উৎপাদনে বদলে গেল আজিজের জীবনের গল্প

পোনা উৎপাদনে বদলে গেল আজিজের জীবনের গল্প

ছবি সংগৃহীত

‘সফলতা’ কয়েক অক্ষরের একটি শব্দ হলেও এর পেছনের গল্প দীর্ঘ। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর হাড়ভাঙা পরিশ্রম দিয়ে লেগে থাকা গেলেই, মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা। এমনই এক সফল ব্যক্তি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার আবদুল আজিজ। তিনি ২০ শতাংশের পুকুরে এক কেজি রেণু দিয়ে শুরু করেন পোনা উৎপাদন। আজ ১৫ একরের ছোট-বড় অর্ধশত পুকুরে উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা। স্বীকৃতি পেয়েছে হ্যাচারি হিসেবে, পেয়েছে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের একাধিক সম্মাননাও। নিজে যেমন সফলতা পেয়েছেন, তার হ্যাচারিতে কর্মসংস্থান হয়েছে অর্ধশত মানুষের।

সময় লেগেছে হয়তো; কিন্তু তিনি দমে যাননি। এক সময় সাইকেলে পাতিল নিয়ে নিজেই গ্রামে গ্রামে ফেরি করতেন মাছের পোনা। সময়ের ব্যবধানে রেণু থেকে আজ নিজেই উৎপাদন করছেন সেই পোনা। আর তার উৎপাদিত পোনা বিক্রি করছে অন্তত ৭০ জন মৌসুমি বিক্রেতা। নিজের জীবনের গল্প বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন অনেকের। বলছি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের চরমজিদ গ্রামের উদ্যোক্তা আবদুল আজিজের কথা।

সমপ্রতি সরেজমিনে গেলে আজিজ বলেন, একসময় উত্তরবঙ্গ থেকে আসা পোনা কিনে বাড়ি বাড়ি ফেরি করতেন তিনি। পরে ২০১২ সালে মাত্র ২০ শতাংশের পুকুরে এক কেজি রেণু দিয়ে পোনা উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে কিছু প্রতিবন্ধকতা পোহাতে হয়েছে তাকে। তবে স্বল্প পরিসরে হলেও কিছুটা লাভ দেখায়, আস্তে আস্তে পোনা উৎপাদনের দিকে ঝোঁকেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সরকারের পিকেএসএফের সহায়তায় স্থানীয় এনজিও সাগরিকার মাধ্যমে প্রশিক্ষণসহ সার্বিক সহযোগিতায় নিজেকে তৈরি করেন প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তা হিসেবে। এভাবে দীর্ঘ এক যুগ চলে তার পোনা উৎপাদন। বর্তমানে তার রয়েছে ১৫ একরের হ্যাচারি। উৎপাদিত হচ্ছে বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা। গত বছর এক কোটি পোনা উৎপাদন করেন তিনি। চলতি বছরের শুরুতেই ২৫ লাখ টাকার পোনা বিক্রি করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছর সব মিলিয়ে ৩৫-৪০ লাখ টাকার পোনা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তার।

সরকারের দেওয়া কলোনির একটি ঘরে থাকতেন আজিজ। বর্তমানে পরিচিতি পেয়েছেন বড় উদ্যোক্তা হিসেবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের একাধিক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। তার হ্যাচারিতে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। আজিজের হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা মানসম্মত হওয়ায় চাহিদাও রয়েছে বেশ। কাছে হওয়ায় মৌসুমি পোনা বিক্রেতারাও পাচ্ছেন সুবিধা।

মৌসুমি পোনা বিক্রেতা আবদুল হক বলেন, আগে তিনিও উত্তরবঙ্গ ও কুমিল্লা থেকে আসা পোনা নিয়ে বিক্রি করতেন। অক্সিজেন দিয়ে আনা ওইসব পোনা মাঝেমধ্যে মারাও যেত। তাছাড়া দূর থেকে আসার কারণে বেশি দামেই কিনতে হতো। তবে গত কয়েক বছর আজিজের হ্যাচারি থেকে পোনা নিয়ে বিক্রি করছেন। এতে করে তিনি প্রতিদিন অন্ততপক্ষে তিন-চারবার হ্যাচারি থেকে পোনা নিতে পারেন। স্থানীয়ভাবে পোনা উৎপাদন হওয়ায় দামও কম পাচ্ছেন। ফলে চাষিদের কাছেও কম দামে বিক্রি করছেন। তাছাড়া আজিজের উৎপাদিত পোনার মান ভালো হওয়ায় ইতোমধ্যে জেলায় বেশ সুনামও রয়েছে তার উৎপাদিত পোনার।

উদ্যোক্তা আজিজ জানান, সরকারিভাবে তেমন সহযোগিতা পান না তিনি। কোনো পরামর্শের প্রয়োজন হলে হাতের কাছে সরকারি মৎস্য বিভাগের কাউকে তেমন একটা পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তারা তাকে সহযোগিতা করছেন। পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতির সহায়তা দিচ্ছে স্থানীয় এনজিও।

এ বিষয়ে কথা হয় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সরকারের পিকেএসএফ-এর বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। তারই অংশ হিসেবে আজিজের হ্যাচারিতে নিয়মিত সার্বিক সহযোগিতা করছে তারা। আজিজকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যান্ত্রিক সহযোগিতা এবং সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছে তারা।

পোনা উৎপাদিত হ্যাচারিগুলোতে সরকারিভাবে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নসহ স্বল্প সুদে ঋণ ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনুরোধ আজিজের। এতে ছোট-বড় পরিসরে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে বলেও মত তার।