ঢাকা-না.গঞ্জ রুটে ট্রেন নিয়ে বাস সিন্ডিকেটের চক্রান্ত
অর্ধ-লাখ যাত্রীর জন্য মাত্র ৪ বগি
ছবি সংগৃহীত
কমিউটার ট্রেনযাত্রীদের বাসমুখী করতে ফের গভীর চক্রান্ত চলছে প্রাচ্যেরডান্ডি নারায়ণগঞ্জে। বাস সিন্ডিকেটের অভিনব কারসাজিতে বিপাকে পড়েছেন অন্তত অর্ধ-লাখ ট্রেনযাত্রী। সাশ্রয়ী খরচে চলাচলকারী এই বিপুলসংখ্যক ট্রেনযাত্রীদের বাসে চড়তে বাধ্য করতে এবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী কমিউটার ট্রেনের বগি কমানো হয়েছে। মাত্র চারটি বগি নিয়ে চলাচল করছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের ট্রেন কমিউটার।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ করার ষড়যন্ত্র বা বগি কমানোর ঘটনা নতুন নয়। আশির দশক থেকেই বাস মালিক সিন্ডিকেট ট্রেনের পেছনে আদাজল খেয়ে লেগে আছে। কি করে ট্রেন চলাচল বন্ধ করা যায়। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের জনগণের দাবির কাছে বরাবরই নস্যাৎ হয়েছে বাস মালিক সিন্ডিকেটের চক্রান্ত। গত ২০২৫ সালের মার্চে এগারোটি বগি নিয়ে ‘আধুনিক কমিউটার’ ট্রেন ঘোষণা দিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের ট্রেন দশটি বগি নিয়ে চলাচল শুরু করেছিল। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় এখন মাত্র চারটি বগি চলাচল করছে। ফলে প্রতিদিন ট্রেনে চড়া নিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এ রুটের যাত্রীরা।
অভিযোগ রয়েছে বাস মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি চক্র বগি সরিয়ে এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যাতে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে বাসে চলাচল করে।
নারায়ণগঞ্জ স্টেশনের মাস্টার কামরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন কারণে এই বগির সংখ্যা কমেছে। এতদিন ছয়টা থেকে সাতটা বগি চলত। গত ১ আগস্ট থেকে ইঞ্জিন ছাড়া ৪টি বগি চলছে। বগি বাড়ানোর জন্য ঢাকায় যোগাযোগ করা হয়েছে। দ্রুতই চলে আসবে বলে আশা করছি।
‘নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরাম’ এর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বাস মালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে। এ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে একদিকে তারা দলীয় ক্যাডার, প্রশাসনহ বিভিন্ন স্তরে মাসোহারা প্রদান করে। আবার এ টাকার একটি অংশ তারা রেলওয়ের নির্দিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেটের জন্য রাখে। আগে এই সিন্ডিকেট ফতুল্লা বা গেণ্ডারিয়ায় জংশনের নামে ট্রেন আটকে রাখত। তারা বিআরটিসির নন এসি বাস বন্ধ করিয়ে দিয়েছে। কারণ সে বাসের ভাড়া ছিল ৪০ টাকা। এখন তারা বগি সরিয়ে রাখছে যাতে মানুষ ট্রেনে না যেতে পারে। এ রুটে এতদিন ১০টি বগি ছিল। এটিও অপর্যাপ্ত। একসময় এ রুটে যখন ১৩টি বগি চলত তখনও দাবি ছিল এ রুটে বগি বাড়ানোর। আর আজকে বগি কমাতে কমাতে এখন মাত্র চারটি বগি চলছে। অবিলম্বে এ রুটে আমরা ১৩টি বগি চালু ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানাই। না হলে আমরা এ দাবিতে নগরবাসীকে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলব।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিন এ ট্রেনটিকে ‘আধুনিক কমিউটার ট্রেন’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নতুন করে চালু করা হয়। যদিও এর সুযোগ-সুবিধা তেমন কিছু বাড়েনি বরং কমেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন কমিউটার ট্রেনে ইঞ্জিন ছাড়া ১০টি বগি ছিল। প্রতিটি বগিতে রেলের হিসাব অনুযায়ী ৫৯২ জন বসে চলাচল করতে পারে। তবে প্রতিদিন এর বহুগুণ বেশি যাত্রী প্রতিটি ট্রেনে দাঁড়িয়ে চলাচল করে। রেলওয়ের হিসেবে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী প্রতি ট্রেনে যায়। এ রুটে আট জোড়া মানে ষোলোটি ট্রেন চলাচল করে। সে হিসেবে প্রতিদিন এ রুটে চব্বিশ হাজার যাত্রী চলাচল করে। তবে বেসরকারি হিসেবে এ রুটে অর্ধলক্ষাধিক যাত্রী চলাচল করে। গত বছর কমিউটার ট্রেন চালুর কয়েক দিনের মধ্যেই এ ট্রেন থেকে একটি বগি সরিয়ে নরসিংদিতে নেওয়া হয়। এরপর আরেকটি বগি সরিয়ে ময়মনসিংহ রুটে নেওয়া হয়। এভাবে সরাতে সরাতে বর্তমানে মাত্র চারটি বগি ও ইঞ্জিন নিয়ে এ ট্রেন চলছে।
সোমবার সকাল নয়টায় নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে কথা হয় গৃহবধূ তাহমিনা আহমেদের সঙ্গে। তিন ও পাঁচ বছর
বয়সি দুই মেয়ে নিয়ে ঢাকার মুগদায় যাবেন। ট্রেন তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। কিন্তু বুধবার এসে তিনি ট্রেনে উঠতেই পারলেন না। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে থামার সঙ্গে সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ হুরোহুরি করে ট্রেনে উঠে গেল। দরজায় পর্যন্ত ঝুলছে। অনেকেই উঠতে পারেনি। তাহমিনা বললেন, ‘এখন বাধ্য হয়ে আমার বাসে ঢাকায় যেতে হবে। ফলে আমার যাতায়াত খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কারন বাস থামে গুলিস্তান। এ ছাড়া জ্যামেও পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। তিনি বলেন, ‘একটা ট্রেন যাচ্ছে। কিন্তু আরও দুইটা ট্রেনের যাত্রী প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন-ই এমন ঘটছে।’
ট্রেনের গেঁটে বেশ ঝুঁকি নিয়েই দাঁড়িয়েছিল নটরডেম কলেজের এইচএসসির ছাত্র শাহেদ আলী। তার বাড়ি শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপারে বন্দরে। বলল, ‘বাসা থেকে শেয়ারের অটোরিকশায় নদীর ঘাটে এসে ট্রলারে পার হয়ে ট্রেনে ওঠেন। ট্রেন ছাড়া তার উপায় নেই। কারণ বাসভাড়া সর্বনিম্ন ৫৫ টাকা। সেখানে ট্রেনের ভাড়া ২০ টাকা। বাসে গেলে গুলিস্তান নেমে আবার রিকশা নিতে হয়। ট্রেনে গেলে হেঁটেই কলেজে যাওয়া যায়। সবচেয়ে কম খরচে কম সময়ে সে কলেজে পৌঁছাতে পারে ট্রেনে।
উল্লেখ্য, ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সেই থেকে এ রুটে ট্রেন চলাচল করছে। বাস ভাড়ার তুলনায় ভাড়া কম হওয়ায় নব্বইয়ের দশক থেকে এ রুটের ট্রেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে রওনা হয়ে এটি চাষাঢ়া, ফতুল্লা, পাগলা, শ্যামপুর, গেণ্ডারিয়ায় থেকে সর্বশেষ কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত যায়। যাত্রীরা যেখানেই নামুক না কেন ২০ টাকা ভাড়া দিতে হয়।