শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রতিনিধি, (কলাপাড়া) পটুয়াখালী

প্রকাশ: ১৯:৪৪, ১৫ আগস্ট ২০২৬

কৃষকের অর্থায়নে করা ভাসমান জীর্ণদশার পাখিমারা সেতু

কৃষকের অর্থায়নে করা ভাসমান জীর্ণদশার পাখিমারা সেতু

ছবি সংগৃহীত

পাখিমারার এই খালটি পেরিয়ে প্রতিবছর হাজারো টন সবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কৃষকরা বাজারে নিয়ে যান। সবজির গ্রামখ্যাত কুমিরমারা, নেয়ামতপুর, এলেমপুরের মানুষ প্রতিদিন কাদা পেরিয়ে এই পথে পাখিমারার সবজির পাইকারি বাজারে যাওয়া আসা করছেন। মাটির রাস্তায় বর্ষায় হাঁটুসমান কাদা থাকে তাই তখন নৌকায় আসতে হয় বেশি দূরের কৃষককে। গত ৩০টি বছর ধরে কৃষি উৎপাদকরা এমন ভোগান্তির ধকলে আছেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জের ইউনিয়নের সবজির হাব খ্যাত গ্রামগুলোর পাঁচ শতাধিক সবজিচাষির এমন দুরবস্থা।

কলাপাড়া উপজেলার ৭০ শতাংশ সবজির চাহিদা মেটানো হয় এসব গ্রাম থেকে। এছাড়া উদ্ধৃত্ত টনকে টন সবজি প্রতিদিন বাস-ট্রাক কিংবা পিকআপযোগে দেশের বিভিন্ন আড়তে সবজিগুলো চালান করা হয়। মানুষগুলো দীর্ঘ ৩০ বছরেও খালের ওপরে একটি ব্রিজের দাবি পূরণ করতে পারেননি। তাদের ভাষ্য, ‘প্রত্যেক বছর ২০-২৫ কোটি টাকার সবজিসহ কৃষিপণ্য উৎপাদন করছি। কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন করছি। অথচ কয়েক কোটি টাকা খরচের একটি গার্ডার ব্রিজ করে দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়নি গুরুত্ত্বপূর্ণ এই গ্রামের মাটির রাস্তা পাকা করে। কবে নাগাদ এটি করা হবে তাও কেউ নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি। শুধু নির্বাচন এলেই আশ্বাস দেওয়া হয়। যার বাস্তবায়ন হয় না।’

আব্দুল আজিজ হাওলাদার জানান, পাখিমারার অন্তত ৩০০ ফুট প্রস্থ খালটি পার হতে এখন কৃষকরা তাদের নিজেদের অর্থায়নে নির্মিত ড্রামের ওপর নির্মিত ভাসমান কাঠের পাটাতনের ব্রিজটির ওপর নির্ভরশীল। এটি কয়েকদফা নিজেদের এবং বিভিন্ন জিও এনজিওর সহায়তায় মেরামত করেছেন। কিন্তু সচল রাখা যাচ্ছে না। কুমিরমারার প্রবীন কৃষক সুলতান গাজী জানান, ৪০-৪৫ বছর ধরে সবজির আবাদ করছেন।

কুমিরমারাসহ তিনটি গ্রামের অন্তত সাড়ে ৫০০ কৃষক প্রতিবছর কম করে হলেও ২০-২৫ কোটি টাকার সবজিসহ কৃষিপণ্য এখান দিয়ে তারা পাখিমারার আড়তে নিয়ে যান। বর্ষায় আরও দুর্ভোগ বেশি। ভেতরের রাস্তা মাটির। কাদা হয়ে যায়।

অথচ একটা পাকা ব্রিজ আজ পর্যন্ত করে দেওয়া হয়নি। জানালেন তিনি, ২০১৬ সালে আরপাঙ্গাশিয়া নদীর ওপর (চাকামইয়ার) ভেঙে পড়া একটা আয়রণ ব্রিজের মালামাল নিয়ে প্রথমে এই খালে একটা ব্রিজ করা হয়। দুই বছর না যেতেই আয়রণ ব্রিজটি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে তখন ব্রিজের ভালো ভালো খুটি, স্লিপার বিক্রি করে অকেজো মালামাল লাগানো হয়েছে। উপজেলা পরিষদ এটি করেছিল বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

আয়রণ ব্রিজটি ভেঙে আজ অবধি পড়ে আছে। এরপরে ভাসমান ড্রাম সেতুটিই তাদের ভরসা। এভাবে বছর থেকে যুগ পেরিয়ে গেলেও কৃষকের ভোগান্তি লাঘবে রাষ্ট্র কিংবা সরকার কেউ এগিয়ে আসেনি। যেখানে ২০-২৫ কোটি টাকার কৃষিপণ্যের জোগান দিচ্ছেন, সেখানে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় একটা ব্রিজ করা হয়নি; কৃষকের প্রতি এমন অনীহা কেন—এমন প্রশ্ন কৃষকের। পাঁচ শতাধিক চাষির জীবন-জীবিকার সহায়ক এই যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থায়ীকরণের জন্য দ্রুত একটা গার্ডার ব্রিজ করার দাবি করেছেন ওখানকার সব শ্রেণির মানুষ।

নীলগঞ্জ ইউনিয়নের প্রশাসক ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. নাহিদ হাসান জানান, পাখিমারার খালে একটি গার্ডার ব্রিজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এটি করবে। নীলগঞ্জের সবজি চাষিদের দুরবস্থা এবং সুবিধার জন্যই এটি করা হচ্ছে বলেও তিনি জানালেন।

এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানান, কুমিরমারার সবজিচাষিসহ সব কৃষকের কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া ও যোগাযোগ সুবিধার জন্য পাখিমারার খালে ৪৯০ মিটার দীর্ঘ একটি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটির ডিজাইন প্রক্রিয়া সম্পন্নের পথে। নেভিগেশন ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। এখন একনেকে অনুমোদনের পরেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটির বাস্তবায়ন হবে বলে আশা পোষণ করলেন এই প্রকৌশলী।