যে গ্রামের নাম হারিয়ে গেছে অভাবে, বাবলীদহ এখন ‘ফকিরপাড়া’
ছবি সংগৃহীত
গ্রামের নাম বাবলীদহ। সরকারি কাগজে-কলমে ও মানচিত্রে সবখানেই সেই নাম। অথচ মানুষের মুখে নামটি যেন হারিয়ে গেছে। আশপাশের মানুষ এখন গ্রামটিকে চেনে ‘ফকিরপাড়া’ নামে। একটি গ্রামের নাম কি তার মানুষের দুঃখে বদলে যেতে পারে?
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এই গ্রামে প্রায় ২ হাজার ১৮ জন মানুষের বসবাস। স্থানীয়দের দাবি, তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ কোনো না কোনোভাবে ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। কারও বয়সের ভার, কারও অসুস্থ শরীর, কারও স্বামী নেই এবং কারও জমিজমা নেই। আবার কেউ কর্মক্ষম হয়েও কাজের অভাবে মানুষের দুয়ারে হাত পাততে বাধ্য হয়েছেন। তাই ‘ফকিরপাড়া’ নামটি এখানে নিছক কোনো ডাকনাম নয়। এটি যেন অভাবের দেওয়া এক নির্মম পরিচয়।
বাবলীদহের বাসিন্দা নুরনবী সরদার (৪৫)। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। ভারী কাজ করার সামর্থ্য নেই। নিজের কোনো জমিজমাও নেই। সরকারি খাস জায়গায় ছোট্ট একটি ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তার সংসার।
বহু বছরের ক্লান্তি নিয়ে নুরনবী বলেন, দাদা ভিক্ষা করতেন, বাবাও ভিক্ষা করেছেন। আমিও এখন ভিক্ষা করি। আমি কিডনি রোগী। ভারী কাজ করতে পারি না। জায়গা-জমিও নেই। তাই ভিক্ষা করেই সংসার চালাই। এ কারণে এক প্রজন্মের পেশা ধীরে ধীরে পরের প্রজন্মের ভাগ্য হয়ে গেছে।
আরেক ঘরে আলফা বেগম (৪৫)। ১০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। আয়ের কোনো স্থায়ী পথ নেই। মানুষের সাহায্য আর ভিক্ষার ওপর নির্ভর করেই চলছে জীবন।
ভাঙা ঘরের দিকে তাকিয়ে আলফা বলেন, মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। যে ঘরে থাকি, সেটিও ভেঙে গেছে। ভিক্ষা করে সংসারই চলে না, মেয়ের বিয়ে দেব কীভাবে?’ কথা বলতে বলতে তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা।
তার ছেলে মনির হোসেনের বয়স মাত্র ১৪। যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই-খাতা, সেই বয়সেই সে শিখে গেছে অভাবের হিসাব। কখনো কখনো মায়ের সঙ্গে তাকেও যেতে হয় ভিক্ষায়।
মনিরের সরল প্রশ্নটি যেন পুরো বাবলীদহের কষ্টকে এক মুহূর্তে সামনে এনে দাঁড় করায়। গরিব হয়ে জন্ম নেওয়াই কি ভুল? আল্লাহ আমাদের কেন গরিব বানালেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শুধু মনিরের জন্য নয়, বাবলীদহের শত শত মানুষের জন্যও জরুরি।
একই গল্প, শুধু মুখগুলো আলাদা। মুন্নি খাতুন, মনিজা খাতুন, মৃত বক্কার আলীর স্ত্রী রজেদা বেগম (৭৫), মৃত নুরু সালামের স্ত্রী কমেলা খাতুন (৬৫), মৃত ভাষা সরকারের স্ত্রী রমেলা খাতুন (৬৫), মৃত জামাল সরকারের ছেলে প্রতিবন্ধী ইনসাফ আলী (৫০), একান প্রামাণিকের স্ত্রী মানসিক ভারসাম্যহীন পরি বেওয়া (৭৫), মনতাজ সরদারের স্ত্রী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সবুরা বেগম (৭৫), মৃত জামাল প্রামাণিকের স্ত্রী হাসনা বেগম এমন আরও অনেকে প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব গল্প এসে মিশেছে একই জায়গায় অভাব।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বাবলীদহের দারিদ্র্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যোগাযোগের সংকটও। বর্ষায় পানি বাড়লে নৌকাই যাতায়াতের প্রধান ভরসা। শুকনো মৌসুমে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার কাঁচা পথ পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। বৃষ্টিতে সেই পথ হয়ে ওঠে কাদায় ভরা দুর্ভোগ। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার কিংবা কাজ—সবকিছুই যেন তাদের নাগালের বাইরে।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. হাফিজুল ইসলাম বলেন, গ্রামের অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় কেউ মাছ ধরে সংসার চালান। কিন্তু শুকনো মৌসুমে কাজের সুযোগ প্রায় থাকে না। অনেকে কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যান।
তার কথায়, ভিক্ষা এখানে সবার পছন্দের পেশা নয়। অনেকের জন্য এটি অভাবের কাছে হেরে যাওয়া মানুষের শেষ আশ্রয়।
উধুনিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জিলিম উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাবলীদহের মানুষের প্রধান সমস্যা কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অসহায়, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও কর্মক্ষমতাহীনদের একটি অংশ বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েছেন। শুধু ভিক্ষা বন্ধ করতে বললে হবে না, তাদের বেঁচে থাকার বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। বাবলীদহের বাসিন্দারা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
কিন্তু বাবলীদহের মানুষের প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সুযোগ। যে মানুষ মাছ ধরতে পারেন, তাকে মাছ ধরার উপকরণ দিতে হবে। যে নারী কাজ করতে পারেন, তাকে আয় করার পথ করে দিতে হবে। তরুণদের দিতে হবে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান। আর যারা সত্যিই অক্ষম, তাদের নিতে হবে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায়।
কারণ ভিক্ষা হয়তো আজকের ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু আগামী দিনের নিশ্চয়তা দেয় না। বাবলীদহের কাঁচা পথ ধরে হাঁটলে দেখা যায় জীর্ণ ঘর, ভাঙা চাল ও পুরোনো টিন। কোথাও বৃদ্ধা বসে আছেন, কোথাও শিশুর চোখে ভবিষ্যতের অজানা কৌতূহল। অভাব তাদের অনেক স্বপ্ন মুছে দিয়েছে। কিন্তু সব স্বপ্ন এখনো মরে যায়নি।
বাবলীদহের মানুষ ভিক্ষুক হওয়ার আগে মানুষ। তাদেরও আত্মসম্মান আছে, স্বপ্ন আছে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা আছে। তাই এই গল্পের শেষ পরিচয় ‘ফকিরপাড়া’ হতে পারে না। একদিন যদি এই গ্রামে পাকা রাস্তা হয়, কাজের সুযোগ আসে, তরুণরা প্রশিক্ষণ পায়, অসহায় পরিবারগুলো যথাযথ সরকারি সহায়তা পায়, তাহলে হয়তো মানুষের মুখেও ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া নামটি। বাবলীদহ।
সেদিন হয়তো কেউ আর বলবে না, ‘ওটা ফকিরপাড়া’—বলবে, ওটা সেই বাবলীদহ যে গ্রাম একদিন অভাবের কাছে হেরে গিয়েছিল, কিন্তু পরে কাজ, স্বপ্ন আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখেছিল। আর মনিরের প্রশ্নের উত্তরও হয়তো সেদিন মিলবে। গরিব হয়ে জন্ম নেওয়া ভুল নয়, সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেঁচে থাকাটাই অন্যায়।