শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

​​​​​​​ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা

প্রকাশ: ১৯:২৮, ১০ আগস্ট ২০২৬

সাতক্ষীরা ভেটখালী সড়ক দুর্ভোগের ফাঁদ

সাতক্ষীরা ভেটখালী সড়ক দুর্ভোগের ফাঁদ

ছবি সংগৃহীত

উপকূলীয় জনপদে দুর্ভোগের ফাঁদে পরিণত হয়েছে সাতক্ষীরা ভেটখালী মহাসড়ক। ৮২২ কোটি টাকার প্রকল্পের গত ১১ মাসে অগ্রগতি ৩২ শতাংশ। কাদা-পানিতে নাকাল যাত্রী ও চালকেরা।

এদিকে সংস্কার আর নির্মাণের নামে মাসের পর মাস সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ সড়কের কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও কাদাপানি। বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই আটকে যাচ্ছে যানবাহন, ঘটছে দুর্ঘটনাও। সাতক্ষীরা ভেটখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ অংশে এমন দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের সংস্কারকাজ এগোচ্ছে কচ্ছপগতিতে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগী, শিক্ষার্থী, নিত্যযাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের। দ্রুত কাজ শেষ না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে উন্নয়নকাজের জন্য রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির পানিতে এসব স্থানে তৈরি হয়েছে কাদা ও খানাখন্দ। পিচ্ছিল সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাঝারি ও হালকা যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সমপ্রতি একটি গর্তে আটকে একটি ইজিবাইক উল্টে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিনই কোনো না কোনো যানবাহন গর্তে আটকে যাচ্ছে কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।

স্থানীয় বাসচালক আব্দুর রউফ বলেন, ‘এই রাস্তায় গাড়ি চালানো মানেই জীবন বাজি রাখা। প্রতিদিন কোনো না কোনো গাড়ি কাদায় আটকে যাচ্ছে বা উল্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। গাড়ি মেরামতের খরচ চালাতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা, পকেটের টাকা গচ্চা যাচ্ছে। দ্রুত রাস্তা ঠিক করা না হলে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’

শ্যামনগর উপজেলা সদরের বাসিন্দা আরিজুল আলম বলেন, ‘আশঙ্কাজনক কোনো রোগীকে এভাবে হাসপাতালে নেওয়া খুবই কঠিন। রাস্তার ঝাঁকুনিতে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংস্কারের নামে সাধারণ মানুষকে এভাবে দুর্ভোগে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না।’

কালীগঞ্জ উপজেলা সদরে মোকাম নাজিমগঞ্জ হাটের ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ ও রাইসুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম। অথচ এখন এটি চরম অবহেলার শিকার। সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগ ও প্রশাসনের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা উচিত। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় এনে দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে।’

৮২২ কোটি টাকার প্রকল্প

সাতক্ষীরা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলা সদরের নিউ মার্কেট থেকে শ্যামনগর উপজেলার ভেটখালি পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য ৬২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির বিভিন্ন অংশ আগে থেকেই খানাখন্দে ভরা ছিল। এর মধ্যে সড়কটির উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৮২২ কোটি টাকা।

২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

৬২ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ পাঁচটি প্যাকেজে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। তবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ থেকে ৩২ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তরসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে সময়ক্ষেপণের কারণেও প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি।

ঠিকাদার দাবি করছেন, অনিয়মের সুযোগ নেই

নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমডি মাঈনুদ্দীন লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যখন কোনো নির্মাণসামগ্রী আনি, তখন সেটার উৎস অনুমোদিত থাকে। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আনা হয়। অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।’

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণসামগ্রীর মানের পাশাপাশি কাজের গতি ও সড়ক ব্যবস্থাপনায়ও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নির্মাণকাজ চলাকালে বিকল্প চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

নতুন করে সময় বৃদ্ধি হয়েছেন ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত

সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, বিভিন্ন জটিলতার কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল দুই বছর ১১ মাস। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট হয়েছে। তবে ১১ মাসে কাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

তিনি বলেন, ‘বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণে ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হয়নি। আশা করছি, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হবে। নির্মাণকাজ নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।’

স্থানীয়দের দাবি, শুধু প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ালেই হবে না; জনদুর্ভোগ কমাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ গর্তগুলো ভরাট, কাদাপানি অপসারণ, যান চলাচলের উপযোগী অস্থায়ী ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর দাবি তাদের।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা মৌসুমে সড়কটির পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ফলে বাড়বে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ। ৮২২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত ও যথাযথভাবে শেষ করে সাতক্ষীরা ভেটখালী মহাসড়কটি নিরাপদ ও চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জেলার বাসিন্দারা।