কলাপাড়ায় ষষ্ঠ থেকে দশমে যেতেই ঝরে পড়ছে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী
কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশেরও বেশি
ছবি সংগৃহীত
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মাধ্যমিক শিক্ষা ভয়াবহ সংকটে পতিত হয়েছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে গড়ে ঝরে পড়ছে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ছে শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি।
দারিদ্র্যের পাশাপাশি বাবা-মায়ের সংসারের আর্থিক জোগান দিতে গিয়ে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কর্মে জড়িয়ে পড়ছে। আবার বাল্যবিয়ের কারণে অসংখ্য ছাত্রী শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। দারিদ্র্য আর বাল্যবিয়ে এখনো ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। এছাড়া যথাযথভাবে বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হয় না। কতিপয় শিক্ষক ক্লাসে পাঠাদান না করে প্রাইভেটভাবে ও বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে পড়তে বাধ্য কিংবা উৎসাহ দেওয়ার ঘটনায় দরিদ্র শিক্ষার্থীরা সঠিক পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকছে। ক্লাসমুখী হচ্ছে না অর্ধেক শিক্ষার্থী। এভাবে মাধ্যমিক শিক্ষায় ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ক্লাসে ষষ্ঠ শ্রেণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও অষ্টম থেকে দশম শ্রেণিতে পৌঁছানোর আগেই গড়ে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে।
কলাপাড়ার মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্যে এমনতর সংকট উঠে এসেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দেয়া তথ্যানুসারে, ২০২২ সালে কলাপাড়ার ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির মোট শিক্ষার্থী ছিল ২ হাজার ৩০৮ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১ হাজার ১৪২ এবং ছাত্রী ১ হাজার ১৬৬ জন। এই ব্যাজটির শিক্ষার্থীরা এ বছর (২০২৬) দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। কিন্তু শিক্ষার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫২৫ জনে। কমেছে ৭৮৩ জন, ঝরে গেছে, যার মধ্যে ছাত্র ৩৯৪ ও ছাত্রী ৩৮৯ জন। শতকরা হারে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যানুসারে ষষ্ঠ থেকে দশমে পৌঁছাতে ৩৩ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে এসব তথ্য। খেপুপাড়া মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। এই প্রতিষ্ঠানে ২০২২ সালে ষষ্ঠতে শিক্ষার্থী ছিল ২৯৮ জন। ছাত্র ১৭৯ ও ছাত্রী ১১৯ জন। এরা এখন দশমে অধ্যয়নরত। কিন্তু সংখ্যা ১৫২ জন, কমেছে ১৪৬ জন। শতকরা ৪৮ দশমিক ৯৯ ভাগ ঝরে গেছে। যার মধ্যে ছাত্র ৮৮ জন, আর ছাত্রী ৫৮ জন। ষষ্ঠে থাকা ২৯৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে অষ্টমে পৌঁছাতে শিক্ষার্থী ছিল ২৪৮ জন। কমেছে ৩১ জন। নবমে গিয়ে পৌঁছেছে ১৫৫ জনে। শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এখন শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিক্ষাব্যবস্থাপনায় নেই কোনো শৃঙ্খলা। অভিযোগ দুপুরের পরে শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ ক্লাসে আসে না। আবার নবম ও দশমে উপস্থিতি কোন কোন শাখায় শূন্যে পৌঁছেছে। অভিযোগ রয়েছে কতিপয় শিক্ষক বিকাল থেকে রাত অবধি সাত-আট বিষয়ে প্রাইভেট কোচিংয়ে শিক্ষাদান করেন। বাণিজ্যিক শিক্ষার ধকলে এই প্রতিষ্ঠানটির চরম বেহাল দশা।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, যে বিষয়ে নিয়োগ দেয়া শিক্ষক তিনি ওই বিষয় পড়ান না। পড়ায় তার ভালো লাগা বিষয়ে। খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল ১৪৮ জন। যারা এখন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা পৌঁছেছে ১০০ জনে। কমেছে ৪৮ জন। একই দৃশ্য লালুয়া সুরাতখান জয়নব বিবি (এসকেজেবি) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। এখানে ঝরে গেছে ৩০ জন। নেই ৫৮ দশমিক ৮২ ভাগ। একই দশা তেগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। এখানে নেই ২৪ জন। নেই ৪০ শতাংশ। এভাবে ধানখালী সোনাগাজী হায়াতুন্নেছা অ্যান্ড আশ্রাফ একাডেমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঝরে গেছে ৪০ জন। উত্তরপূর্ব পাটুয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কমেছে ২৫ জন। তুলাতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৬ জন। ঝরে পড়ার হার ৪৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। হাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঝরে গেছে ৪০ জন। ঝরে গেছে ৫৭ শতাংশের বেশি। মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঝরে গেছে ৪৬ জন। মধ্য টিয়াখালী আলহাজ কেরামত হাওলাদার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৬ জন। ঝরে পড়ার হার ৫৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ধুলাসার বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঝরে গেছে ২১ জন। চরচাপলী ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে গেছে ৫৬ জন। গড়ে এখানকার ২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশমে পৌঁছাতে ঝরে যাচ্ছে গড়ে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিক্ষার্থী। তবে কুয়াকাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বেতমোড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লোন্দা হাফিজ উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো।
লালুয়া জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা জানায়, তার সহপাঠীদের মধ্য থেকে ইতি, লামিয়া, তিষা, সাথী, নাদিম, শাহদাৎ, মুনসুর, সাইফুল ও রিফাত ঝরে গেছে। এর মধ্যে মেয়েদের অধিকাংশ বিয়ে হয়ে গেছে। কারও সন্তান রয়েছে। করছে ঘর সংসার। ছেলেদের অনেকে শ্রমজীবীর কাজ করছে। একই ক্লাসের জান্নাতিও জানায়, সহপাঠী মিম, রুবিনা ও কলি শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে গেছে। এই দুই শিক্ষার্থীর দাবি দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। পাশাপাশি মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বখাটেপনার শিকারও এক ধরনের বড় সমস্যা রয়েছে। তারা জানায়, বর্তমানে একশ্রেণির কিশোর-যুব মাদকসেবীর কারণে বাড়ি থেকে স্কুল পর্যন্ত আসা এবং স্কুল থেকে বাড়িতে যাওয়া অনেকটা অনিরাপদ। এ কারণেও বহু ছাত্রীকে মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেন। তারা এমনও মন্তব্য করে যে, তাদের সহপাঠীদের মধ্যেও কেউ কেউ বখাটেপনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহসিন রেজা জানান, মূলত বাল্যবিয়েই তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। অভিভাবকদের অসচেতনতায় এটি হচ্ছে। চরচাপলি ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গাজী আলী আহম্মেদ জানান, মূলত ছেলেদের মধ্যে শতকরা ৭০ শতাংশ দরিদ্রতার কারণে এবং ছাত্রীদের মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশ বাল্যবিয়ের কারণে স্কুল থেকে ও শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। করোকাল থেকে এমন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি এই শিক্ষকের। এখান থেকে এখন পর্যন্ত বেরিয়ে আসা যায়নি। কিন্তু অভিভাবকরা দাবি করছেন ওই দুটি কারণ ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কতিপয় শিক্ষক নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ক্লাসে পড়ায়। তারা তাদের মতো করে দেরিতে ক্লাসে আসেন। আবার চলে যান নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। যথাযথ মনিটরিং নেই। তারা প্রাইভেট কোচিং ও অন্যান্য কাজকে প্রধান্য দিচ্ছেন। ঝরে পড়া রোধে নেই কোন প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ। কলাপাড়া উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মনিরুজ্জামান খান জানান, এমন সমস্যা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান জানান, মাধ্যমিক শিক্ষার এই সংকট উত্তরণের চেষ্টা চলছে। দরিদ্র ও মেধাবীদের শিক্ষা সহায়তা এবং বাল্যবিয়ে বন্ধে সতেচনতার পাশাপাশি আইনি প্রতিকার চলছে। এছাড়া অভিভাবক সমাবেশের মধ্য দিয়ে সচতেনতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।