কাঁকরোল ক্ষেতে দুর্বৃত্তের হানা, কৃষকের স্বপ্ন চুরমার
ছবি সংগৃহীত
ক্ষেতজুড়ে কাঁকরোল। বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছিল, তবুও হাল ছাড়েননি কৃষক আবুল হাসেম। পরিচর্যা আর পরিশ্রমে আবারও ফলন ফিরছিল। রোববারও ক্ষেত থেকে তুলেছিলেন প্রায় ৩০০ কেজি কাঁকরোল। পরদিন সকালে সাড়ে ১৮ হাজার টাকায় বিক্রিও করেন।
এরপর ক্ষেতে ফুলে পরাগায়ন করতে গিয়ে দেখেন, গোড়া থেকে কেটে ফেলা হয়েছে ফলন্ত কাঁকরোল গাছগুলো। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তার কয়েক মাসের শ্রম, আর চুরমার হয়ে যায় প্রায় ৮ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন।
সম্প্রতি ঘটনাটি ঘটেছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের সেমপ্রুপাড়া এলাকার আমতলী পাড়ায়। স্থানীয় কৃষক আবুল হাসেমের প্রায় ৬০ শতক জমির ফলন্ত কাঁকরোলগাছ কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা বলে অভিযোগ তার। এতে প্রায় আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।
আবুল হাসেম জানান, তিনি প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষি। এবার প্রায় ৬০ শতক জমিতে কাঁকরোল চাষে আড়াই লাখ টাকা খরচ করেছেন। জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিতে ক্ষেত ও ফলনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপরও গাছ ও ফল টিকিয়ে রাখতে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। গত দুই সপ্তাহে প্রায় এক লাখ টাকার কাঁকরোল বিক্রিও করেছেন।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে ক্ষেত থেকে প্রায় ৩০০ কেজি কাঁকরোল তোলেন। রোববার সকালে সেগুলো বিক্রি করে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা পান। এরপর ক্ষেতে ফুলে পরাগায়নের কাজে গিয়ে দেখেন, কে বা কারা ফলন্ত কাঁকরোল গাছগুলো গোড়া থেকে কেটে দিয়েছে।
আবুল হাসেম জানান, সকালে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির পর বিকালে রোদ ওঠায় কেটে দেওয়া গাছগুলো শুকিয়ে মরতে শুরু করে। ক্ষেতের অবস্থা দেখে তিনি অপরিপক্ব কাঁকরোলও তুলে নিতে বাধ্য হন। এতে আরও ৩০০ কেজির বেশি কাঁকরোল নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন তিনি।
কৃষক আবুল হাসেমের আশা ছিল, বৃষ্টির পর বাজারে সবজির চাহিদা বাড়ায় এবার কাঁকরোল বিক্রি করে আট থেকে ১০ লাখ টাকা আয় করবেন। সেই টাকা দিয়ে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কয়েকটি গরু মোটাতাজা করার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু দুর্বৃত্তদের এমন কর্মকাণ্ডে সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে পড়েছে।
আবুল হাসেম বলেন, ‘আমি প্রান্তিক একজন কৃষক, বর্গাচাষি। কঠোর পরিশ্রম করে ক্ষেতটি দাঁড় করিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল এবার কিছু টাকা আয় করে ঘুরে দাঁড়াতে পারব। কিন্তু প্রতিবেশী কেউ প্রতিহিংসা থেকে এমন কাজ করে থাকলে আমার আর্থিক ও মানসিক—দুভাবেই বড় ক্ষতি হলো। আল্লাহ এর বিচার করবেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা আদম আলী বলেন, মানিকছড়ির অধিকাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। একজন কৃষকের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল এভাবে কেটে নষ্ট করে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এমন নিষ্ঠুর ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
একটি ক্ষেতের সঙ্গে শুধু সবজি নয়, জড়িয়ে থাকে একজন কৃষকের স্বপ্ন, সংসারের হিসাব আর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা। আবুল হাসেমের ক্ষেতের গাছগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না। তবে দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অন্তত অন্য কৃষকের ঘামঝরা ফসলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হবে।