রোহিঙ্গা সংকট কি ফিলিস্তিন সমস্যার দিকেই মোড় নিচ্ছে?
ফিরোজ হাসনাত: জাতিগত সংকট শুধু মিয়ানমারের মধ্যে নয়, আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যেও বিভিন্ন দেশের মধ্যে হয়েছে। বিংশ শতাব্দীজুড়ে ফিলিস্তিন সমস্যা যত বেশি আলোচিত, একবিংশ শতাব্দীতে এসে রোহিঙ্গা সমস্যাও ঠিক তেমনি আলোচিত। ফিলিস্তিন সমস্যা ও রোহিঙ্গা সমস্যা একটি সহজ উচ্চারিত, কিন্তু অত্যন্ত জটিল মানবিক সমস্যা। ফিলিস্তিন সমস্যার মূল কথা হলো একই ভূখণ্ডের ওপর আরব ও ইহুদিদের দাবি, আর রোহিঙ্গা সমস্যার মূলকথা হলো একই ভূখণ্ডের ওপর রোহিঙ্গা ও রাখাইন বৌদ্ধদের দাবি। আশঙ্কা হয় মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্য ফিলিস্তিনের মতো দখল না হয়ে যায়। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেছেন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। তিনি আরও বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না। তার এ ধরনের মন্তব্য দেখে বাংলাদেশের হতাশ হওয়ারই কথা। ইউএনএইচসিআরের প্রধানের কথা থেকে এটাও বোঝা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া যত সহজে হওয়ার কথা, তত সহজে হচ্ছে না। রাখাইনের প্রাদেশিক সরকারের সচিব টিন মং সোয়ে গত বছরের ১৬ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম মংডু ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এদিকে ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ কলকাতা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের (আইসিসিআর) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভার ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে প্রায় আট লাখ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আরও বহুসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। টিং মং সোয়ে শুধু মংডু এলাকার রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। মংডু ছাড়াও রথিডং এবং বুথিডং থেকে লোক কিন্তু বাংলাদেশে এসেছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কোনোক্রমেই ১০ লাখের কম নয়। এদিকে গত সপ্তাহেও প্রায় হাজারখানেক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। রোহিঙ্গাদের মতো ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তু সমস্যা এখনও বিদ্যমান। প্যালেস্টাইন অ্যাকাডেমিক সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও ৪৩ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু রয়েছে, যার মধ্যে জর্ডানে ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬৩৯ জন, লেবাননে চার লাখ ২১ হাজার ২৯২, সিরিয়ায় চার লাখ ২২ হাজার ৬৯৯, মিসরে ৬২ হাজার ৮৪৬, সৌদি আরবে তিন লাখ ১৪ হাজার ২২৬, কুয়েত ও উপসাগরীয় দেশে এক লাখ ৬৬ হাজার ৮৬, লিবিয়া ও ইরাকে এক লাখ ১৭ হাজার ২৭৬ এবং অন্যান্য আরব দেশে ছয় হাজার ৬২১ জন রয়েছে। এখনও ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান বাস্তবায়িত হয়নি। ফিলিস্তিন সমস্যার প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ শাসনামলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়েছিল তা সমাধানের লক্ষ্যে। ১৯২০ সালে মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের সংঘর্ষের পর পলিন কমিশন, ১৯২১ সালে হে ক্রাফট কমিশন, ১৯২৯ সালে সংঘর্ষের পর ১৯৩০ সালে শ কমিশন, ১৯৩৬ সালে পিল কমিশন ও ১৯৩৮ সালে উডহেড কমিশন গঠিত হয়। সবসময়ই দেখা গেছে, কমিশনের প্রস্তাবাবলির প্রতি ইহুদিরা সবসময় উপেক্ষা প্রদর্শন করেছে এবং যৎসামান্যই বাস্তবায়ন করেছে। ঠিক একইভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ঘানার নাগরিক কফি আনানের নেতৃত্বে মিয়ানমারের ছয় নাগরিক এবং নেদারল্যান্ডস ও লেবাননের দুই নাগরিককে নিয়ে ৯ সদস্যের কমিশন গঠিত হয়। এক বছর ধরে মিয়ানমারের সিটওয়ে, মংডু, বুথিডং, ইয়াঙ্গুন ও নেইপিদো ছাড়াও ব্যাংকক, ঢাকা, কক্সবাজার ও জেনেভায় ১৫৫টি বৈঠক করে প্রায় এক হাজার ১০০ ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে কমিশন প্রতিবেদন তৈরি করে। আনান কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ৮৮টি সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল পৌনে ৬টায় জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাব পেশ করেন। এক. অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারের সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা। দুই. অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা। তিন. জাতিধর্ম নির্বিশেষে সব সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় ‘সেফ জোন’ গড়ে তোলা। চার. রাখাইন রাজ্য থেকে জোর করে বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজস্ব ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। পাঁচ. নিঃশর্তভাবে কফি আনান কমিশনের সুপরিশমালা পরিপূর্ণভাবে ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা।এতৎসত্ত্বেও আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিনকিয়াও ও শীর্ষ নেত্রী অং সান সূচি কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেননি, বরং তারা সচেতনভাবেই এ বিষয়টি এড়িয়ে চলতে সচেষ্ট বলেই প্রতীয়মান। আনান কমিশনের সুপারিশ ও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়া ফিলিস্তিনি সমস্যাকেন্দ্রিক কমিশনগুলোর সুপারিশমালা না হওয়াকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংঘবদ্ধ আগমন (আলিয়া) ম্যানডেটরি শাসনের আগে ঘটলেও বাকি চারটি আলিয়া ব্রিটিশ শাসনামলেই ঘটে। এই সংঘবদ্ধ আগমন ফিলিস্তিন সমস্যার অন্যতম কারণ। পঞ্চম ও শেষ আলিয়াতেই সর্বাপেক্ষা বেশি সংখ্যক ইহুদি প্যালেস্টাইনে প্রবেশ করে, যদিও বর্তমানে ইহুদি বসতি স্থাপন অব্যাহত রয়েছে ফিলিস্তিনে। নিচের পরিসংখ্যান থেকে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলিয়া বছর আগত ইহুদির সংখ্যা প্রথম: ১৮৮২-১৯০৩ ৩০ হাজার দ্বিতীয়: ১৯০৪-১৯১৪ ৪০ হাজার তৃতীয়: ১৯১৯-১৯২৩ ৩৫ হাজার চতুর্থ: ১৯২৪-১৯৩১ ৮২ হাজার পঞ্চম: ১৯৩২-১৯৪৮ তিন লাখ বর্তমানে এই ইহুদি বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ইহুদিদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত ফিলিস্তিনিরা। ঠিক তেমনই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সমস্যা দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গাশূন্য গ্রামে রাখাইনদের বসতি স্থাপন নিয়ে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সিআরআর কর্মসূচির আওতায় ২৫০ জনকে (৬৪টি পরিবার) কোয়েতানকাউকে স্থানান্তর করা হয়েছে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী রাখাইনদের জন্য নতুন বসতি নির্মাণ হিসাবে প্রাথমিক পর্যায়ে রাখাইনের কোয়েতানকাউককে বেছে নেওয়া হলেও ধারণা করা হচ্ছে পর্যায়ক্রমে সিত্তেমংডু ও বুথিডংয়ের যেসব জায়গায় রোহিঙ্গাশূন্য গ্রাম রয়েছে, সেগুলোতে রাখাইনদের নতুন বসতি স্থাপন করা হবে। রাখাইনদের নতুন বসতি নির্মাণ কি ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে ইহুদিদের বসতি নির্মাণের মতোই সমস্যা তৈরি করবে? বাংলাদেশে যে ১০ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে অবস্থান করছে তারা আবার মিয়ানমারে ফেরত গেলে তাদের অবস্থান তখন রাখাইন রাজ্যের কোথায় হবে? নাকি এখন থেকেই মিয়ানমার সরকারের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বিতাড়নের পরিপ্রেক্ষিতে রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইনদের স্থায়ীভাবে নতুন বসতি স্থাপন করা হচ্ছে? তাহলে কি রোহিঙ্গা সমস্যা ফিলিস্তিন সমস্যার দিকেই মোড় নিচ্ছে?
গবেষক