শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা রহমান 

প্রকাশ: ১০:৩৪, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুনাফা গেল তলানিতে

আমরা নেটওয়ার্কস পুঁজিবাজারের অর্থ নিল ১৪৯ কোটি টাকা 

আমরা নেটওয়ার্কস পুঁজিবাজারের অর্থ নিল ১৪৯ কোটি টাকা 

ছবি সংগৃহীত

তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সেবার বিস্তারের কারণে এ খাতের ব্যবসার পরিধি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাংলাদেশেও ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে আইটি ও আইটি-সক্ষম সেবার চাহিদা বাড়ছে। তবে এই বৈশ্বিক ও স্থানীয় প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আমরা নেটওয়ার্কসের আর্থিক পারফরম্যান্সে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
কোম্পানিটির কয়েক বছরের আর্থিক ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের আগে মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বাড়লেও অর্থ উত্তোলনের পর সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়নি। বরং দুই দফা অর্থ সংগ্রহের পরই কোম্পানিটির ইপিএসে বড় ধরনের পতন হয়েছে। সর্বশেষ মুনাফার পরিবর্তে লোকসানে চলে গেছে কোম্পানিটি।
২০১৭ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে আমরা নেটওয়ার্কস। এর কয়েক বছর পর ২০২৪ সালে আবারও রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করে প্রতিষ্ঠানটি। দুই দফায় কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ১৪৯ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। কিন্তু অর্থ উত্তোলনের আগে যে মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, অর্থ সংগ্রহের পর সেটি আর অব্যাহত থাকেনি। এই ধারাবাহিকতা কোম্পানিটির ব্যবসার স্থায়িত্ব, অর্থ সংগ্রহের পর মূলধনের ব্যবহার এবং মুনাফা ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০১৭ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় আমরা নেটওয়ার্কস। আইপিওতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৯ টাকা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৩৫ টাকা। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। 
আইপিওর আগের কয়েক বছরের আর্থিক ফল দেখলে কোম্পানিটির ইপিএসে ধারাবাহিক উত্থান দেখা যায়। ২০১১ সালে আমরা নেটওয়ার্কসের শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ১ টাকা ৫৩ পয়সা। চার বছরের ব্যবধানে ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ১৬ পয়সায়। আইপিওর আগে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এ সময় কোম্পানিটির মুনাফার প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে কোম্পানিটি। তবে তালিকাভুক্তির পর মুনাফার সেই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা আর দেখা যায়নি; বরং কয়েক বছরের ব্যবধানে ইপিএসে ক্রমাগত পতন ঘটে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ৪ টাকা ১ পয়সা। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪ টাকায়। এরপর ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৩ টাকা ১৯ পয়সা থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে ইপিএস নেমে আসে ২ টাকা ১৪ পয়সায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে আরও কমে তা দাঁড়ায় ১ টাকা ৮৫ পয়সায়। আইপিওর সময়ের আশপাশে তুলনামূলকভাবে উচ্চ ইপিএস থাকলেও পরবর্তী কয়েক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে কোম্পানিটির ইপিএস বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, অর্থ উত্তোলনের পর তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ ব্যবসায় কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইপিওর পর কয়েক বছর মুনাফায়
 পতনের ধারাবাহিকতার মধ্যেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমরা নেটওয়ার্কসের আর্থিক ফলে আবার বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়। ওই অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ৬৪ পয়সায়। একই সময়ে নিট মুনাফা হয় ২২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আগের কয়েক বছরের তুলনায় এই মুনাফা ও ইপিএসের প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য।
শুধু মুনাফা নয়, ওই বছর লভ্যাংশও বাড়ানো হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ১১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোম্পানিটি। এর আগে বেশ কয়েক বছর ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দেওয়ার পর এ বছর লভ্যাংশ বাড়ানো হয়। এরপরই আসে কোম্পানিটির দ্বিতীয় দফা বড় অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ।
২০২৪ সালে দুটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয় আমরা নেটওয়ার্কস। প্রতিটি রাইট শেয়ারের ইস্যুমূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩০ টাকা। এর মধ্যে ১০ টাকা ছিল অভিহিত মূল্য এবং ২০ টাকা প্রিমিয়াম। রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানিটি ৯২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। ফলে আইপিওর ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার সঙ্গে রাইট শেয়ারের ৯২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা যোগ করলে দুই দফায় পুঁজিবাজার থেকে কোম্পানিটির সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪৯ কোটি টাকা। দুই দফা অর্থ উত্তোলনের পর আমরা নেটওয়ার্কসের মূলধন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। আইপিওর মাধ্যমে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ঋণ পরিশোধে এবং বাকি অর্থ ব্যবসা সমপ্রসারণে ব্যবহারের কথা ছিল। রাইট শেয়ার থেকে সংগৃহীত অর্থের মধ্যেও ২১ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যয়ের কথা জানানো হয়। অবশিষ্ট অর্থ ব্যবসার উন্নয়নে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল।
পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্যই থাকে কোম্পানির ব্যবসার সক্ষমতা বাড়ানো, ঋণের চাপ কমানো, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ আয় ও মুনাফার ভিত্তি শক্তিশালী করা। কিন্তু আমরা নেটওয়ার্কসের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফা অর্থ সংগ্রহের পর আর্থিক ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাইট শেয়ার ইস্যুর সময়ের উচ্চ ইপিএস পরবর্তী সময়ে দ্রুত কমে গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ইপিএস ছিল ৩ টাকা ৬৪ পয়সা, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ টাকা ৪৬ পয়সায়। এক বছরের ব্যবধানে ইপিএস কমে যায় ১ টাকা ১৮ পয়সা। এরপর পতনের গতি আরও বেড়ে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস নেমে আসে মাত্র ১৩ পয়সায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে ৩ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে ইপিএস কমে ১৩ পয়সায় দাঁড়ায়। সবশেষে কোম্পানিটির আর্থিক ফল মুনাফা থেকে লোকসানের দিকে চলে গেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে, অর্থাৎ জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে আমরা নেটওয়ার্কসের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৪ পয়সা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ৭৭ পয়সা। একদিকে আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৭৭ পয়সা, অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের একই সময়েই সেটি ঋণাত্মক ৪৪ পয়সায় নেমে গেছে। এতে কোম্পানিটির আয়ক্ষমতার অবনতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একটি কোম্পানি যখন পুঁজিবাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা থাকে ওই অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসা সমপ্রসারিত হবে এবং ভবিষ্যতে আয় ও মুনাফা বাড়বে। কিন্তু অর্থ সংগ্রহের পর যদি ইপিএস ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার ও তার প্রত্যাশিত ফল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আমরা নেটওয়ার্কসের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় দফা অর্থ সংগ্রহের পর এমনই একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শুধু ইপিএস নয়, লভ্যাংশের তথ্যেও কোম্পানিটির আর্থিক পারফরম্যান্সে পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ছয় বছর কোম্পানিটি ১০ শতাংশ করে লভ্যাংশ দিয়েছে। অর্থাৎ তালিকাভুক্তির পর কয়েক বছর বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়ার ধারাবাহিকতা ছিল। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তুতির সময় লভ্যাংশ বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করা হয়। ওই বছর কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল ২২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং ইপিএস ৩ টাকা ৬৪ পয়সা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি মাত্র শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। একদিকে ১১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ থেকে ০.১০ শতাংশে নেমে আসা, অন্যদিকে ইপিএস ৩ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে ১৩ পয়সায় কমে যাওয়া—দুটিই একই সময়ে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। এরপর চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ইপিএস ঋণাত্মক হওয়ায় সামনে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আমরা নেটওয়ার্কসের রাইট শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ কোম্পানিটির বর্তমান বাজারদর।
রাইট শেয়ারের প্রতিটি ইউনিট ৩০ টাকা দরে ইস্যু করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ টাকা অভিহিত মূল্য এবং ২০ টাকা প্রিমিয়াম। কিন্তু গত ৬ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১৭ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ রাইট শেয়ারের ইস্যুমূল্য ৩০ টাকার তুলনায় বাজারদর ১২ টাকা ৩০ পয়সা কম। শতাংশের হিসাবে বর্তমান বাজারদর রাইট শেয়ারের ইস্যুমূল্যের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ নিচে। এতে রাইট শেয়ারে ৩০ টাকা দরে বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীরা বাজারদরে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে কোম্পানিটির মুনাফা কমে লোকসানে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ আয় ও লভ্যাংশ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে আমরা নেটওয়ার্কসের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৯২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাইরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা ৬৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ কোম্পানিটির উল্লেখযোগ্য অংশের মালিকানা রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাইরে থাকা বিনিয়োগকারীদের হাতে। ফলে কোম্পানির আর্থিক পারফরম্যান্সের পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিপুলসংখ্যক সাধারণ বিনিয়োগকারীর ওপর। বিশেষ করে যারা রাইট শেয়ারে ৩০ টাকা দরে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের জন্য ১৭ টাকা ৭০ পয়সার বর্তমান বাজারদর একটি বড় পার্থক্য তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ইপিএসের ধারাবাহিক পতন বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ রিটার্ন নিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে একটি কোম্পানির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংগৃহীত অর্থের কার্যকর ব্যবহার। আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে ব্যবসার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হলে সেই অর্থের প্রভাব পরবর্তী কয়েক বছরের আর্থিক ফলাফলে প্রতিফলিত হওয়ার প্রত্যাশা থাকে।
আমরা নেটওয়ার্কসের ক্ষেত্রে দুই দফা অর্থ উত্তোলনের আগে ও পরের আর্থিক ফল পাশাপাশি রাখলে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া যায়। প্রথম দফায়, অর্থাৎ আইপিওর আগে ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ইপিএস ১ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ১৬ পয়সায় দাঁড়ায়। কিন্তু আইপিওর পর কয়েক বছরের মধ্যে ইপিএস কমতে কমতে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ টাকা ৮৫ পয়সায় নেমে আসে। দ্বিতীয় দফায় রাইট শেয়ার ইস্যুর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইপিএস বেড়ে ৩ টাকা ৬৪ পয়সায় দাঁড়ায়। কিন্তু পরের অর্থবছরেই তা কমে ২ টাকা ৪৬ পয়সা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে ১৩ পয়সায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেখা দেয় ৪৪ পয়সার শেয়ারপ্রতি লোকসান।
দুটি সময়পর্বের তথ্য পাশাপাশি রাখলে অর্থ উত্তোলনের আগে মুনাফা বৃদ্ধির পর অর্থ উত্তোলনের পর তা ধরে রাখতে না পারার একটি পুনরাবৃত্ত প্রবণতা চোখে পড়ে। তবে শুধু এই আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে মুনাফা বৃদ্ধিকে কৃত্রিম বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায় না। মুনাফার পরিবর্তনের পেছনে ব্যবসার আয়, ব্যয়, সুদ ব্যয়, বাজার পরিস্থিতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিচালন ব্যয়সহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই আর্থিক ফলাফলের এই প্রবণতা কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও অর্থ ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আমরা নেটওয়ার্কসের বর্তমান আর্থিক চিত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুই দফা বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের পরও মুনাফায় টেকসই প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। আইপিওর মাধ্যমে ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং রাইট শেয়ারের মাধ্যমে ৯২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা—মোট প্রায় ১৪৯ কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থের একটি অংশ ঋণ পরিশোধে এবং বাকি অংশ ব্যবসা সমপ্রসারণ ও উন্নয়নে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল।
আমরা নেটওয়ার্কসের কোম্পানি সচিব সৈয়দ মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। 
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করলে নির্ধারিত উদ্দেশ্য অনুযায়ী সেই অর্থ ব্যবহার করছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনেও প্রকৃত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করতে হয়। কোনো কোম্পানির মুনাফা ও ইপিএসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে বিষয়টি পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তথ্য-উপাত্ত ও প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির ব্যবসা সমপ্রসারণ ও দীর্ঘ মেয়াদে আয় সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু অর্থ উত্তোলনের আগে মুনাফা বাড়ার পর পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে কমে গেলে বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য অবশ্যই সতর্কতার। বিশেষ করে রাইট শেয়ারের অর্থ সংগ্রহের পর ইপিএস কমে লোকসানে চলে গেলে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং ব্যবসায় তার প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু এর পরবর্তী আর্থিক ফলাফলে ইপিএসের পতন, লভ্যাংশের বড় ধরনের সংকোচন এবং সর্বশেষ লোকসানের তথ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাইট শেয়ারের ক্ষেত্রে ৩০ টাকা ইস্যুমূল্যের বিপরীতে বাজারদর ১৭ টাকা ৭০ পয়সায় নেমে আসা এবং একই সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক হওয়া পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানির জন্য শুধু অর্থ সংগ্রহ করাই শেষ কথা নয়। সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, বিনিয়োগ থেকে কী ধরনের আয় এসেছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে তা কোম্পানির মুনাফা ও শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্নে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত কোম্পানির সক্ষমতা মূল্যায়নের মূল ভিত্তি।
আমরা নেটওয়ার্কসের ক্ষেত্রে পাওয়া কয়েক বছরের তথ্য বলছে, অর্থ উত্তোলনের আগে মুনাফা ও লভ্যাংশে উত্থান থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা স্থায়ী হয়নি। প্রথম দফায় আইপিওর পর ইপিএসে ধারাবাহিক পতন এবং দ্বিতীয় দফায় রাইট শেয়ার ইস্যুর পর মুনাফা থেকে লোকসানে চলে যাওয়ার প্রবণতা কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার বড় পরিবর্তনকে সামনে এনেছে।