জনবল সংকটে পূর্বাঞ্চল রেল, বন্ধ ৫৩ স্টেশন
ছবি সংগৃহীত
তীব্র জনবল সংকটে কার্যত চাপের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। স্টেশন মাস্টার, গেটকিপার, পয়েন্টসম্যান ও লোকোমাস্টারসহ ট্রেন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্টেশন পরিচালনা, রেলক্রসিং ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবা। জনবল না থাকায় পূর্বাঞ্চলের ৫৩টি স্টেশনও বন্ধ রয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় নাজিরহাট লোকালসহ পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের আটটি ট্রেন এ ব্যবস্থায় চলছে। নতুন ছয়টি যুক্ত হলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪টিতে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের জনবল ঘাটতির কারণে কর্মরতদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে। বিশেষ করে গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যানের সংকটে রেলক্রসিং ও স্টেশন পরিচালনায় নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে লোকোমাস্টারের ঘাটতির কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সময়সূচি ঠিক রাখার ক্ষেত্রে।
পূর্বাঞ্চল চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-১) পদে অনুমোদিত ২৭টি পদের একটিতেও কর্মকর্তা নেই। গ্রেড-২-এর ৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। এ গ্রেডে শূন্য রয়েছে ৬৩টি পদ।
স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-৩) পদে ১৫৬টির মধ্যে কর্মরত ১৩৪ জন, শূন্য ২২টি। গ্রেড-৪-এর ২৪৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৬৬ জন এবং শূন্য রয়েছে ১৭৯টি।
এ ছাড়া ৩৬৬টি সহকারী স্টেশন মাস্টার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৪৭ জন। শূন্য রয়েছে ২১৯টি পদ। কেবিন মাস্টারের ৪০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৭ জন, শূন্য ২৩টি।
সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান পদে। ৪৫০টি অনুমোদিত গেটকিপার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯৪ জন, শূন্য ২৫৬টি পদ। আর ৯৮৫টি পয়েন্টসম্যান পদের মধ্যে কর্মরত ৫৫৮ জন, শূন্য রয়েছে ৪২৭টি।
গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় কর্মরত জনবল অনেক কম। ফলে একজন কর্মীকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় কর্মী না থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়ছে।
জনবল সংকট মোকাবিলা, সেবার মানোন্নয়ন ও আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে পূর্বাঞ্চলের আরও ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে।
তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রুটের নাজিরহাট লোকাল, নরসিংদী কমিউটার, নোয়াখালী এক্সপ্রেস, সমতট এক্সপ্রেস, জয়দেবপুর কমিউটার ও ঝারিয়া লোকাল। এসব ট্রেন চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও নোয়াখালী রুটে চলাচল করে।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ধারণা, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলে এসব ট্রেন থেকে আয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। টিকিট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরার পাশাপাশি কালোবাজারিও কমবে বলে আশা করছেন তারা।
এ বিষয়ে রেল ভবনে প্রজ্ঞাপন তৈরির কাজ চলছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর নতুন ব্যবস্থাপনায় ট্রেনগুলো কবে থেকে চলবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (চট্টগ্রাম) ফারহান মাহমুদ জানান, নাজিরহাট লোকালসহ পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রেল ভবন থেকে প্রজ্ঞাপনের কপি পাওয়ার পর কবে থেকে এগুলো নতুন ব্যবস্থাপনায় চলবে, তা জানা যাবে।
পূর্বাঞ্চলে জনবল সংকটের কারণে ৫৩টি রেলস্টেশন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ। স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান না থাকায় অনেক স্টেশনের সিগন্যাল কক্ষ ও টিকিট কাউন্টার বন্ধ রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা বিভাগের ৩২টি স্টেশন সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের বন্ধ স্টেশনের সংখ্যা ১৯। চট্টগ্রাম বিভাগের বন্ধ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে— বারৈয়াঢালা, মিরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালিদহ, শশদী, নাওটি, আলীশহর, ময়নামতি, ঝাউতলা, সরকারহাট, কাঞ্চননগর, ধলঘাট, দৌলতগঞ্জ, খিলা, বজরা, শাহাতলী ও চিতোষী রোড।
স্টেশন বন্ধ থাকায় স্থানীয় যাত্রীসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রেলওয়ের রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব স্টেশনের অবকাঠামো ও মূল্যবান সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
বিভাগীয় পরিবহন বিভাগ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব স্টেশন চালু করা যাচ্ছে না। জনবল চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ হলে পর্যায়ক্রমে বন্ধ স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জনবল সংকটের প্রভাব পড়েছে সরাসরি ট্রেন পরিচালনায়ও। পূর্বাঞ্চলে ১২০ জন লোকোমাস্টারের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৬৫ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ৫৫ জন কম লোকোমাস্টার দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, জনবল ঘাটতির কারণে কর্মরত লোকোমাস্টারদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ছে। আগে অতিরিক্ত দায়িত্বের সঙ্গে মাইলেজসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া গেলেও সেসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে অনীহা তৈরি হয়েছে। এতে ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক জানান, মাইলেজসহ বেশ কিছু সুবিধা বাতিল হওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে লোকোমাস্টারদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়েছে। আগে জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত দায়িত্বের পরও অতিরিক্ত কাজ করা হতো এবং এর জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেত। তিনি জানান, রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী ১০০ মাইল বা আট ঘণ্টা ট্রেন পরিচালনার জন্য রানিং স্টাফরা এক দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ রানিং ভাতা বা মাইলেজ পেতেন। বর্তমানে সেই সুবিধা নেই। রেলওয়ের কর্মীদের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা এবং ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুবিধা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানান কর্মরতরা।
জনবল সংকট শুধু ট্রেন পরিচালনা বা স্টেশন ব্যবস্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। পূর্বাঞ্চলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগেও বড় ধরনের জনবল ঘাটতি রয়েছে। রেলওয়ের ২৪ হাজার ৪৪১ একর জমি দেখভালের জন্য অনুমোদিত ১৪৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৬ জন। শূন্য রয়েছে ৯৮টি পদ। অর্থাৎ এ বিভাগে অনুমোদিত জনবলের প্রায় ৬৮ শতাংশই নেই।
এর মধ্যে সহকারী ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার দুটি, লিটিগেশন ইন্সপেক্টরের পাঁচটি, ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী (অঙ্কন) মিলিয়ে চারটি, সার্কেল অফিসারের সাতটি এবং ফিল্ড কানুনগোর তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া উচ্চমান সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর ও জুনিয়র ড্রাফটম্যানসহ বিভিন্ন পদেও জনবল সংকট রয়েছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রেলের জমি নিয়মিত তদারকি ও দখলমুক্ত করার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে রেলওয়ের মূল্যবান সম্পত্তি দখলের ঝুঁকিও বাড়ছে।
চট্টগ্রাম ও সদর ভূ-সম্পত্তি বিভাগের দুটি কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ থাকলেও পর্যাপ্ত যানবাহন ও চালক না থাকায় দ্রুত অভিযান পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ সুবক্তগীন জানান, নাজিরহাট লোকালসহ পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ঢাকা থেকে এখনো চিঠি ইস্যু হয়নি। বিভিন্ন স্টেশন বন্ধ রয়েছে। কিছু স্টেশনে লোকবল নিয়োগ দিয়ে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট দ্রুত কাটানো না গেলে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবায় চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে রেলক্রসিং ও স্টেশন ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা এবং রেলের বিপুল ভূ-সম্পত্তি সুরক্ষাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।