শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

​​​​​​​ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ০০:০৩, ৩০ আগস্ট ২০২৬

না.গঞ্জের ব্যবসায়ীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

ছবি সংগৃহীত

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে মেশিন চালানো যাচ্ছে না, আবার কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন বারবার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানি আদেশ হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের ডাইং, নিটিং, স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট কারখানাগুলো এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ডাইং কারখানায় কাপড় প্রক্রিয়াজাত না হলে গার্মেন্টসের পরবর্তী ধাপের কাজ এগোয় না। ফলে ডাইং খাত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে গার্মেন্ট শিল্পে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ডাইং কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ওই খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; এর প্রভাব পড়বে কাটিং, সুইং, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত পোশাকের চালান নির্ধারিত সময়ে পাঠানো সম্ভব না হলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে দেশের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ আমজাদ হোসেন জানান, নারায়ণগঞ্জে ছোট-বড় কয়েক হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব কারখানার একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। বিশেষ করে ডাইং ও টেক্সটাইল কারখানায় বয়লার, ডাইং মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস প্রয়োজন। গ্যাসের চাপ কমে গেলে মেশিনের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনক্ষমতা পাওয়া যায় না। অনেক সময় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়। আবার গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও বিদ্যুৎবিভ্রাট হলে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয় না।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংকটের কারণে কারখানাগুলোকে একই সঙ্গে দুই ধরনের ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে। প্রথমত, উৎপাদন কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের মজুরি, কারখানার ভাড়া, ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদনের প্রতিটি ইউনিটের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কম উৎপাদন হচ্ছে। কিছু কারখানায় একাধিক শিফট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার যেসব কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস দুই সংকটই রয়েছে, সেখানে উৎপাদন পরিকল্পনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে রপ্তানিমুখী শিল্পে। কারণ বিদেশি ক্রেতারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য চান। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতারা অন্য দেশের সরবরাহকারীর দিকে চলে যেতে পারেন। এতে শুধু একটি কারখানা নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই ক্ষতির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ ডাইং ও ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, ডাইং ও টেক্সটাইল খাতকে উৎপাদনশীল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ পোশাক রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে এসব শিল্প সরাসরি সম্পৃক্ত।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বর্তমানে শিল্পকারখানাগুলো এমনিতেই কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতার চাপ সামলাচ্ছে। এর সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তার জন্য পরিস্থিতি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

শিল্পমালিকদের অভিযোগ, গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে বয়লার ও উৎপাদন মেশিন স্বাভাবিকভাবে চালানো যায় না। এতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্ডার শেষ করতে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করাও সম্ভব নয়।

এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওঠানামায়ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক মেশিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিদ্যুৎ ফিরে এলেও মেশিন আবার চালু করতে সময় লাগে। ফলে কর্মঘণ্টার একটি বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত কাঁচামালও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলো শুধু স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; জাতীয় রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে। এ অঞ্চলের শিল্পকারখানায় লাখো শ্রমিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব শ্রমিকদের আয় ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়ে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ বাড়ানো বা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শিল্পাঞ্চলগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের আলাদা পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের আশঙ্কা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে নারায়ণগঞ্জের শিল্প খাতের ক্ষতি আরও বাড়বে। একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান সংকোচন এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর ডাইং শিল্পে উৎপাদন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তার ঢেউ সরাসরি গার্মেন্ট শিল্পে গিয়ে আঘাত করবে।

ফলে ব্যবসায়ী মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পের চাকা কতদিন এভাবে ধুঁকবে? উদ্যোক্তাদের দাবি, শিল্পকারখানাকে সচল রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতির পরিমাণ শুধু নারায়ণগঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে দেশের রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।