খুন, চাঁদাবাজি ও অপহরণে উদ্বেগ
বিশেষ অভিযানেও নারায়ণগঞ্জে অপরাধের লাগাম নেই
ছবি সংগৃহীত
পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে। এর মধ্যেই নারায়ণগঞ্জে একের পর এক ঘটছে খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও সহিংসতার ঘটনা। কোথাও ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরোধ গড়াচ্ছে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে, কোথাও অস্ত্রের মুখে ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ উঠছে। আবার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীর মরদেহ। নিখোঁজ তরুণের মরদেহ মিলছে অন্য জেলার নদীতে।
১২ অক্টোবর রাতে সিদ্ধিরগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন একাধিক মামলার আসামি হিসেবে পরিচিত সাহেব আলী। একই রাতে বন্দরে ব্যবসার পাওনা টাকা নিয়ে সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ৭২ বছর বয়সী মাকসুদা বেগমের। এর আগের দিন ফতুল্লায় এক পোশাক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে তিন কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ফতুল্লায় অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার এবং নারায়ণগঞ্জের এক নিখোঁজ তরুণের মরদেহ মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীতে পাওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল। তবে ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের বিশেষ অভিযান অপরাধ দমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে অভিযানের পাশাপাশি অপরাধের ধরন, সংঘটিত হওয়ার স্থান, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক এবং অপরাধের পর তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাও জরুরি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক বিরোধের পাশাপাশি অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং মরদেহ গোপন করার মতো গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ । এখানে ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবসায়িক বিরোধ যেন সংঘর্ষে রূপ না নেয়, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত হয় এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়—এসব ক্ষেত্রে পুলিশের দৃশ্যমান সাফল্য দরকার।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু কয়েকটি অপরাধের বিবরণ নয়; এগুলো অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা যাচাইয়েরও উপলক্ষ। বিশেষ অভিযান চলার পাশাপাশি অপরাধের কারণ চিহ্নিত করা, জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারলেই মানুষের আস্থা ফিরবে।
সিদ্ধিরগঞ্জের ওয়াপদা কলোনিতে গোলাগুলির ঘটনায় সাহেব আলীর মৃত্যু যেমন অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধের অভিযোগ সামনে এনেছে, তেমনি বন্দরে পাওনা টাকা নিয়ে সংঘর্ষে একজন বয়স্ক নারীর মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয় বিরোধের সহিংস রূপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে ফতুল্লায় ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ সত্য হলে, তা হবে ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের ওয়াপদা কলোনি এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে গুলিবিদ্ধ হন সাহেব আলী (৪০)। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত পৌনে ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, নিজ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলের জেরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। গুলিবিদ্ধ সাহেব আলী রাস্তার পাশের একটি খালে পড়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাহেব আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অন্তত ১৫টি মামলা ছিল। তবে মামলার সংখ্যা ও অভিযোগের বিবরণ আদালতের নথি এবং পুলিশের রেকর্ডের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। এই ঘটনায় কারা গুলি চালিয়েছে, বিরোধের কারণ কী এবং অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।
সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বন্দরের মাহমুদপুর এলাকায় ব্যবসার পাওনা টাকা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন মাকসুদা বেগম (৭২)। তিনি ওই এলাকার মৃত নাজির সরদারের স্ত্রী। ঘটনায় তার ছেলে রাসেলসহ কয়েকজন আহত হন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মাকসুদা বেগমের ছেলে জজ মিয়া স্থানীয় সাদ্দামের কাছে একটি স্টিল মিলের জন্য দুই ট্রাক লোহা বিক্রি করেছিলেন। ওই লোহার প্রায় ১০ লাখ টাকা বকেয়া ছিল। পাওনা টাকা চাইতে সোমবার রাতে জজ মিয়া তার মা ও ভাই রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে সাদ্দামের কাছে যান। এ সময় প্রথমে কথাকাটাকাটি, পরে হাতাহাতি এবং একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ হয়।
বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন জানান, ব্যবসায়িক পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে সংঘর্ষে কার কী ভূমিকা ছিল, কার আঘাতে মাকসুদার মৃত্যু হয়েছে এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা জরুরি।
ফতুল্লার ইসদাইরের অক্টো অফিস এলাকার নিঝুম সোসাইটির গলি থেকে রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন পোশাক ব্যবসায়ী সাগর হোসেন (৩২)। তার অভিযোগ, তাকে একটি পোশাক কারখানায় অন্তত ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং তিন কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
সাগর ফতুল্লার দেওভোগ নূর মসজিদ এলাকার শরিফ হোসেনের ছেলে। ঘটনাটি সত্য হলে, জনবহুল এলাকায় একজন ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলবে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়, অপহরণের উদ্দেশ্য, মুক্তিপণ দাবির প্রমাণ এবং ভুক্তভোগীকে উদ্ধারের পরিস্থিতি সম্পর্কে পুলিশের তদন্তের তথ্য প্রয়োজন। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে।
গত ৮ অক্টোবর দুপুরে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরমুক্তারপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে শিশির কুমার বীর (২০) নামের এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের পালপাড়া এলাকার প্রয়াত বিপ্লব বীরের ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তিনি দুই দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। মুক্তারপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আব্দুল মাবুদ মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানান।
শিশির কীভাবে নিখোঁজ হলেন, তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে এবং মৃত্যুর সঙ্গে কোনো অপরাধ জড়িত কি না, তা ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে ১১ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে ফতুল্লার ভূইগড় এলাকায় সোনালী মার্কেটসংলগ্ন রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে হাত-পা বাঁধা বস্তাবন্দি এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ২২ বছর। পরনে ছিল সালোয়ার-কামিজ। পরিচয় শনাক্ত, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং তাকে সেখানে ফেলে যাওয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, তা উদ্?ঘাটন এখন তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা যথেষ্ট নয়। অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান, মামলা নিষ্পত্তির হার, আসামি গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার, অভিযোগপত্র দাখিল এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। একই সঙ্গে বিশেষ অভিযানে কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং সেই অভিযানের পর অপরাধ কমেছে কি না, তারও পরিমাপযোগ্য হিসাব প্রয়োজন।