পাঁচ বছরেই আয়ু হারাচ্ছে ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভ
১ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের বড় ঝুঁকিতে রেলওয়ে
ছবি সংগৃহীত
আমেরিকার প্রোগ্রেস রেল থেকে কেনা বাংলাদেশ রেলওয়ের ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভগুলো মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় চলাচলের যোগ্যতা হারাচ্ছে। ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১,১২৩.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০টি ব্রড-গেজ লোকোমোটিভ কেনার জন্য চুক্তি সই হয়েছিল, যা ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চলাচল শুরু করে। রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী একটি ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের সাধারণ অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর হওয়ার কথা থাকলেও, মাত্র ৫ বছরের মধ্যে এগুলো বিকল হয়ে পড়ায় এখন অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৬ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হচ্ছে। এর ফলে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আমেরিকার বিখ্যাত ক্যাটারপিলার কোম্পানির অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান প্রোগ্রেস রেল ও বাংলাদেশ রেলওয়ের মধ্যে ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মোট ৪০টি ব্রড-গেজ লোকোমোটিভ কেনার জন্য ১,১২৩.৫ কোটি টাকা ব্যয়ের চুক্তি সাক্ষরিত হয়। আমেরিকার বিখ্যাত ক্যাটারপিলার কোম্পানির অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান প্রোগ্রেস রেলের ইলেক্ট্রো-মোটিভ ডিজেল (ইএমডি) এগুলো তৈরি করে।
রেল সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের মেকানিক্যাল কোড ম্যানুয়াল এবং স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম অনুযায়ী, ৬৬০০ সিরিজসহ যেকোনো ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের সাধারণ অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর ধরা হয়ে থাকে। তবে ৫ বছরের মধ্যেই আমেরিকার প্রোগ্রেস রেল হতে আমদানিকৃত লোকোমোটিভ ইতোমধ্যে চলাচলের যোগ্যতা হারিয়েছে যার ফলে রেল বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে চলেছে। রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, যথা সময়ে ওয়ারেন্টি সার্ভিস মোতাবেক রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এমন বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। এবং রক্ষণাবেক্ষণ এবং বড় ধরনের ওভারহোলিং বা সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে এগুলো ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত সচল রাখা সম্ভব হতো বলে জানান কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানান, ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রোগ্রেস রেলের সাথে এই ৪০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ক্রয়ের চুক্তি করা হয়। ৩ বছরের এই ওয়ারেন্টি সময়কালে চুক্তি অনুযায়ী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা ত্রুটি দেখা দিলে মেরামত করে দিবেন। এবং সে মোতাবেক তারা মেরামত করেছেন কিন্তু প্রশ্ন হলো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা বাংলাদেশ ত্যাগ করার কয়েক বছরের মধ্যেই কেন একসাথে ৪৪৫ এবং সংশোধিত হয়ে পরবর্তীতে ১৮৬টি আইটেম মেরামত করতে হচ্ছে? চুক্তির আগে কেন এই লোকোমোটিভের পার্টস ও প্রযুক্তি সম্পর্কে যথাযথভাবে সাম্ভ্যবতা যাচাই করা হয়নি? এখানে রেলের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার ফলেই ২০ বছরের আগেই ৫ বছরের মধ্যে এই লোকোমোটিভ অচল হয়েছে।
এদিকে ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষনের এই বিশাল ব্যয় সম্পর্কে জানতে চেয়ে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পশ্চিম) রাজশাহী, মো. আমিনুল হাসানকে একাধিকবার ফোন কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে সে সময় প্রগ্রেস রেলের পক্ষে আলবার্টভিল, আলাবামা নামে এক কর্মকর্তা প্রগ্রেস রেলের ওয়েব সাইটে লেখেন যে, ক্যাটারপিলার ইনকর্পোরেটেডের একটি সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রোগ্রেস রেল। সর্বাধুনিক লোকোমোটিভ প্রযুক্তিতে সজ্জিত ৪০টি ইএমডি ও জিটি৪২এসিএল ব্রডগেজ লোকোমোটিভ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এগুলো হবে বাংলাদেশে কোম্পানিটির সরবরাহ করা প্রথম ব্রডগেজ লোকোমোটিভ। মাইক্রোপ্রসেসর নিয়ন্ত্রণ এবং এসি/এসি ট্র্যাকশনসহ ৩,২৫০ ব্রেকিং হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এই লোকোমোটিভগুলো উল্লেখযোগ্য জ্বালানি সাশ্রয়, কম দূষণ, সর্বাধুনিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য, সেইসাথে উল্লেখযোগ্য মাল বহন ক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্যতা প্রদান করবে। প্রোগ্রেস রেল আমাদের ঐতিহাসিক ইএমডি ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েকে প্রথম মিটার গেজ লোকোমোটিভ সরবরাহ করে।
এদিকে তৎকালীন প্রোগ্রেস রেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিলি এইন্সওয়ার্থ উল্লেখ করেন, ূআমরা সরাসরি এবং অংশীদারদের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ১৫০টিরও বেশি মিটার গেজ লোকোমোটিভ সরবরাহ করেছি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য রেলওয়ে কর্তৃক আবারও নির্বাচিত হতে পেরে আমরা সম্মানিত, এবং এবার আমাদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ব্রড গেজ রেল নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং স্টক বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান উল্লেখ করেন ূ প্রোগ্রেস রেল ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকোমোটিভ সরবরাহ করে আসছে এবং আমরা এই ৪০টি অত্যাধুনিক লোকোমোটিভ সরবরাহের জন্য প্রোগ্রেস রেলের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এবং ৪০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রবৃদ্ধি এবং উন্নত কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
নথিতে দেখা যায়, কমিটি ১৮৬ দফা আইটেমের একটি সংশোধিত খুচরা যন্ত্রাংশের তালিকা প্রস্তুত করেছে, যার প্রাথমিক মূল্যমান আনুমানিক প্রায় ১,৮৬,০৫,০০০,০০ (এক কোটি ছিয়াশি লক্ষ পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার)। উক্ত তালিকাটি বাস্তবভিত্তিক, কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ এবং রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিষেবা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উপযোগী বলে কমিটি মত প্রকাশ করছে।
এদিকে রেলের নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ৬৬০০ সিরিজ লোকোমোটিভের মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড সার্ভিস কন্ট্রাকের ১৮৬ দফা আইটেমের একটি সংশোধিত খুচরা যন্ত্রাংশের তালিকা অনুমোদিত হলে ৬৬০০ সিরিজ লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম আরও গতিশীলতাসহ লোকোমোটিভ বিকলতা হ্রাসসহ প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সার্বিক অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।