শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ সাদী খান 

প্রকাশ: ০১:১৫, ১৮ আগস্ট ২০২৬

যাত্রীসেবায় গতি আনতে ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাড়ছে মেট্রোরেল ট্রিপ

যাত্রীসেবায় গতি আনতে ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাড়ছে মেট্রোরেল ট্রিপ

ছবি সংগৃহীত

রাজধানীবাসীর জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন মেট্রোরেলে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন মাত্রা। যাত্রীদের ক্রমবর্ধিষ্ণু চাপ সামলাতে এবং নিত্যদিনের যাতায়াত আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে সময়সূচি বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে রাতে একটা মেট্রোরেলের বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্কানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, নগরবাসীর নৈশকালীন যাতায়াত সহজ করতে এবং কর্মজীবী মানুষদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রতিদিনের ট্রিপসংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। সকালে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগেই প্রথম ট্রেন ছাড়বে এবং রাতে শেষ ট্রেন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হবে আরও দেরিতে। এর ফলে পিক আওয়ারের ভিড় কমবে এবং অপেক্ষার সময়ও নেমে আসবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
বাংলাদেশ সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান শেয়ার বিজকে জানান, মেট্রোরেল উত্তরা থেকে সর্বশেষ ছেড়ে আসে রাত ৯টা ৫০ মিনিটে আর মতিঝিল থেকে উত্তরার উদ্দেশে ছেড়ে যায় সর্বশেষ যেটা, সেটা প্লাটফর্ম ত্যাগ করে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে। এ পর্যায়ে বিশেষ করে রাতে নতুন করে সময় বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নেই। তবে রাতে চলমান দুটি ট্রেনের মধ্যবর্তী যে সময়, সেটা সমন্বয় করে রাতে নতুন আরেকটা মেট্রোরেল চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। 
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সমন্বয় করে একটা নতুন একটা  মেট্রো রেল বাড়ানোর সিদ্ধান্তসহ সর্বমোট ৩০টি টিপের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।  অর্থাৎ উত্তরা থেকে ছেড়ে আসা সর্বশেষ ট্রেন ও মতিঝিল থেকে উত্তরার উদ্দেশ্যে ছাড়া যাওয়া মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হবে। 
নতুন করে কেন মেট্রোরেলের সংখ্যা বাড়ানোর চাহিদা তৈরি হলো—জানতে চাইল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, প্রতিদিন ঢাকা শহরে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রাম থেকে নতুন নতুন লোক ঢাকায় কাজের সুবাদে আসছে-যাচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার মানুষকে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কারণেই ঢাকায় ছুটে আসতে হচ্ছে। তারাও সময় বাঁচাতে মেট্রোরেল ব্যবহার করে থাকেন। সামগ্রিকভাবে যাতায়াত ব্যবস্থা যাতে দ্রুত ও সহজতর হয়, সে কারণে নতুন করে আরেকটা মেট্রোরেলের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এসেছে। 
তিনি আরও বলেন, আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতি করতে বদ্ধপরিকর। আমরা এমন একটা কানেকটিভিটি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে রাজধানীর
সঙ্গে আশপাশের এলাকাগুলোর মানুষ অফিস বা কাজ শেষ করে যেন নির্দিষ্ট স্থানে দ্রুত সময়ের মধ্যে চলে যেতে পারেন। এসব কারণ বিবেচনা করে মেট্রোরেলের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ঢাকা থেকে কাজ শেষ করে তারা যেন ফিরে যেতে পারেন, এটাই আমাদের প্রধানতম লক্ষ্য। 
প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান আরও বলেন, মানুষ যেন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক বসবাসের চিন্তা না করেন, সে কারণে কানেকটিভিটি বাড়াতে চায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে কাজ শেষ করেই ফিরে যেতে পারবেন। ঢাকা শুধু কর্মযজ্ঞ শহর হিসেবে বিবেচিত হবে, কর্ম শেষ হলে মানুষ ফিরে যাবে নিজ গন্তব্যে। 
মেট্রোরেলের চাহিদা বেড়েছে কি না—জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু মেট্রোরেলের চাহিদা বাড়েনি, সব গণপরিবহনের চাহিদা বেড়েছে। যেহেতু নতুন কর্মসংস্থান পাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ আসছে, সে কারণে সব ধরনের গণপরিবহনের চাহিদা বেড়েছে এবং সে কারণে আজ ১৮ আগস্ট ঢাকা শহরে নারীদের জন্য নতুন করে পিংক বাস চালু করতে যাচ্ছি। এছাড়া ঢাকা শহরের মধ্যে যেসব আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড আছে, সেসব সরিয়ে সিটি বাসস্ট্যান্ড ঢাকায় রেখে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু মেট্রোরেল নয়, সব গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। নতুন করে মনোরেল সংযুক্ত করা হবে এবং ঢাকার আশেপাশে কমিউটার ট্রেন চালু করা, অর্থাৎ সব দিক দিয়ে বর্তমান সরকারের চিন্তা করতে হচ্ছে।  
ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, নতুন মেট্রোরেলের একটা সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রতিদিন আরও কয়েক হাজার নতুন যাত্রী সহজেই তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। ট্রাফিকের চরম ভোগান্তি এড়িয়ে নগরবাসী যেমন সময় বাঁচাতে পারবেন, তেমনই রাতের বেলায়ও নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন।
এদিকে মেট্রোরেলের সময়সীমা বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। তাদের মতে, এটি রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় আরও এক ধাপ বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীবাসীর যাতায়াত সহজতর ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে ঢাকা মেট্রোরেলের পরিচালনা সময়সূচিতে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এবং চালুর পর থেকে প্রতি বছরই  মেট্রোরেলের যাত্রীসংখ্যা ও টিকিট বিক্রি থেকে ভালো রাজস্ব আদায়ের ফলে সরকার নতুন সময়সূচি বৃদ্ধিতে আগ্রহী। 
জানা যায়, গত  ২০২২-২৩ অর্থবছর (আংশিক সময়) উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত টিকিত বিক্রি থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছর উত্তরা থেকে মতিঝিল (পূর্ণাঙ্গ রুট চালু) পর্যন্ত অর্জিত রাজস্বের পরিমাণ ছিলো ২৪৪ কোটি টাকা। এবং গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) থেকে প্রায় ৪৪৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর বেশিরভাগ অংশই এসেছে টিকিট বিক্রি থেকে।
ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা যায়, এই আয় দিয়ে বর্তমান পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও সরকারের নেওয়া বিশাল অঙ্কের ঋণের কিস্তি পরিশোধের তুলনায় তা এখনো কম। তারা বলছেন, ২০২৫ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সরকারের ওপর বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে। তবে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) নেওয়া বিশাল অঙ্কের ঋণের বিপরীতে এই সময়ে সরকারের বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৬৫ কোটি থেকে ৭৪০ কোটি টাকার মধ্যে। অর্থাৎ মেট্রোরেলের আয় দিয়ে ঋণের কিস্তি পুরোপুরি মেটানো এখনো সম্ভব হয়নি।
মেট্রোরেল সূত্রে জানা যায়, ভবিষ্যৎ ব্যয় সংকোচন ও টিকিট বিক্রির আয় বাড়াতে এবং মূল প্রকল্পের পরিচালন ব্যয় কমাতে বেশ কিছু কৌশলগত নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া শুধু টিকিট বিক্রির ওপর নির্ভরতা কমাতে স্টেশনগুলোর ভেতরে এবং কাছাকাছি স্থানে বাণিজ্যিক স্কেস ও দোকান লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। স্টেশন প্লাজা এবং ট্রেনের ভেতরে বিজ্ঞাপন খাতের পরিধি বাড়িয়ে বিকল্প রাজস্ব আয়ের উৎস তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে দিনে সর্বোচ্চ চার লাখ যাত্রী যাতায়াত করলেও অফ-পিক আওয়ারে ট্রেনের ব্যবধান কমিয়ে এবং সেবার সময় বাড়িয়ে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা সরাসরি টিকিট বিক্রি থেকে বিশাল রাজস্ব বাড়াবে।