চীনা উদ্যোক্তার যোগসাজশে লাভেলোর শেয়ার কারসাজি
ছবি সংগৃহীত
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন পর্যালোচনা করে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় আট ব্যক্তি ও দুই প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
শুধু আর্থিক জরিমানার মধ্যেই বিএসইসির ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই ঘটনায় লাভেলো আইসক্রিমের চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক, তার নিকটাত্মীয় মো. জাহিদুল হক এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠান তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একজন চীনা উদ্যোক্তা ও একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিএসইসির তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে একাধিক সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম প্রায় সাড়ে তিন গুণে পৌঁছায়।
বিএসইসির তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ারের বাজারদর ছিল ২৯ টাকা ৮০ পয়সা। এরপর ধারাবাহিকভাবে শেয়ারটির দাম বাড়তে থাকে। ১২ জুলাই দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১০৮ টাকা ৪০ পয়সায়।
অর্থাৎ ২৯ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১০৮ টাকা ৪০ পয়সায় উন্নীত হওয়ার ফলে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৭৮ টাকা ৬০ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ২৬৪ শতাংশ।
তবে প্রদত্ত তদন্ত-তথ্যে শেয়ারটির দাম বৃদ্ধিকে ৭৬ টাকা ৮০ পয়সা বা ২৫৭ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই প্রতিবেদনে বিএসইসির নথিতে ব্যবহূত হিসাব এবং বাজারদরের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময়কালের শেয়ার লেনদেন বিশ্লেষণ করেই বিএসইসি কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে। তদন্তে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো যোগসাজশের মাধ্যমে লেনদেন করে বাজারে শেয়ারটির দাম ও লেনদেনের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির দায়ে মোট আট ব্যক্তি ও দুই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজকে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং বিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইটি ম্যানেজমেন্টকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ব্যক্তিদের মধ্যে এএইচএম রুহুল্লাকে ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা, শারমিন আক্তারকে ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, রাজন কুমার সাহাকে ২ লাখ টাকা, ইয়াসমিন কাননকে ৩৩ লাখ টাকা, মো. মাসুদ রানাকে ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আবু সাদাত মো. ফয়সালকে ৪২ লাখ টাকা, আদিবা আজাদকে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং মোহাম্মদ আরিফ হোসেনকে ৫২ লাখ ৭২ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে, শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন ও কৃত্রিমভাবে দাম প্রভাবিত করার অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিশেষ করে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে সমন্বিত লেনদেন বা সুবিধাভোগী পক্ষের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখছে কমিশন।
কারসাজির ঘটনায় শুধু জরিমানাই নয়, আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। লাভেলো আইসক্রিমের চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক, তার নিকটাত্মীয় মো. জাহিদুল হক এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠান তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করবে বিএসইসি।
অর্থাৎ তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন মনে করেছে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শুধু প্রশাসনিক বা আর্থিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বিষয়টি ফৌজদারি আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থানকে আরও কঠোর করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ শেয়ারদর ও লেনদেনে কৃত্রিম প্রভাব সৃষ্টি করে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হলে তা বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে।
লাভেলোর শেয়ার কারসাজির ঘটনায় চীনা উদ্যোক্তা ফুয়াং লিফের নামও এসেছে। তিনি চীনা নাগরিক হলেও প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশে বসবাস করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠান—লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ এবং বিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট—লাভেলোর শেয়ার লেনদেনের ঘটনায় বিএসইসির তদন্তে এসেছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে যথাক্রমে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে একই ঘটনায় ফুয়াং লিফেকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সকেও সতর্ক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কারসাজির সঙ্গে জড়িত সহযোগী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও কমিশনের নজরে এসেছে। ফলে শুধু সরাসরি শেয়ার লেনদেনে অংশ নেওয়া ব্যক্তি নয়, তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সহযোগী পক্ষগুলোর ভূমিকা নিয়েও তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একাধিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
এর মধ্যে রয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ১৭(ই)(২) ও ১৭(ই)(৫) ধারা, ২০১০ সালের ১৪ জুলাই কমিশনের নোটিফিকেশন এবং সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ২(১)।
বিএসইসির তদন্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টরা যোগসাজশের মাধ্যমে বিধিবহির্ভূত লেনদেনে যুক্ত হয়ে মুনাফা করার চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের কার্যক্রমকে পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। সাধারণত কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, ব্যবসায়িক সমপ্রসারণ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বাজার পরিস্থিতি কিংবা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা ভূমিকা রাখে। কিন্তু এসব মৌলিক কারণের বাইরে সমন্বিত বা কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হলে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হতে পারেন।
বিএসইসি জানিয়েছে, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। কারসাজি বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লাভেলো আইসক্রিমের ঘটনায় কমিশনের এনফোর্সমেন্ট ডিভিশন পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। জরিমানা, ফৌজদারি মামলা এবং সতর্কতামূলক পদক্ষেপ—তিন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তই দেখাচ্ছে, তদন্তে পাওয়া অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
পুঁজিবাজারে কারসাজির অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও লেনদেন নিয়ে বিএসইসি তদন্ত করেছে। তবে সামপ্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থার দিকেও যাচ্ছে।
লাভেলোর ঘটনায়ও একই ধরনের কঠোর অবস্থান দেখা গেল। বিশেষ করে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম তদন্তকালে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার পর লেনদেনের ধরন খতিয়ে দেখা হয়। লাভেলো আইসক্রিমের ঘটনায় বিএসইসির সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে শুধু মূল্যবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি, ব্যবসার অবস্থা, প্রকাশিত তথ্য এবং লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ কোনো শেয়ারের বাজারদর দ্রুত বাড়লেও তার পেছনে কোম্পানির মৌলিক ভিত্তির সমর্থন না থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়ানো হলে সেই দামে শেয়ার কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার নিয়ে বিএসইসির তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে একই সঙ্গে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর লেনদেনের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে পুঁজিবাজারে কারসাজি শনাক্ত করতে শুধু একটি বা দুটি অ্যাকাউন্ট নয়, পারস্পরিক সম্পর্ক ও লেনদেনের পুরো চিত্র বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় এখন নজর থাকবে বিএসইসির পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে। জরিমানা আরোপের পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সতর্ক করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আইন লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, সেটিও নজরদারির আওতায় আসতে পারে।
লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেন নিয়ে বিএসইসির তদন্তে পুঁজিবাজারে কারসাজির একটি বিস্তৃত চিত্র সামনে এসেছে। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা, তিন পক্ষের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং দুই পক্ষকে সতর্ক করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কমিশন স্পষ্ট করেছে—শেয়ারদর ও লেনদেনকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।