শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা রহমান 

প্রকাশ: ০০:৪১, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫৬৫ কোটি টাকার হিসাব মেলেনি প্রাইম ইসলামী লাইফে

৫৬৫ কোটি টাকার হিসাব মেলেনি প্রাইম ইসলামী লাইফে

ছবি সংগৃহীত

দেশের জীবন বীমা খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন ও অনিশ্চিত বিনিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা করে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন কোম্পানিটির নিরীক্ষকরা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির বিপুল পরিমাণ অর্থ দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী বিভিন্ন খাতে আটকে রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্ধারিত সীমার তুলনায় ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগে’ অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর মধ্যে অনাদায়ী বিভিন্ন খাতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ২১১ কোটি টাকার বেশি। সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের ঘাটতি ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগে’ নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত বিনিয়োগ রয়েছে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
প্রাইম ইসলামী লাইফের বিনিয়োগের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আদায় না হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের মধ্যে পিএফআই সিকিউরিটিজে ১৬৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা রয়েছে। এর পাশাপাশি অনাদায়ী মুনাফা, লভ্যাংশ ও ভাড়া বাবদ রয়েছে ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
এ ছাড়া পিএফআই সিকিউরিটিজে আরও ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা রয়েছে। এসব অর্থ মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী রয়েছে।
অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে পাওনা অর্থ আদায় না হলেও তা কোম্পানির আর্থিক হিসাবে রয়েছে। নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে দীর্ঘদিনের এই অনাদায়ী অর্থের বিষয়ে ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
জীবন বীমা কোম্পানির জন্য বিনিয়োগ থেকে আয় এবং সেই বিনিয়োগের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পলিসিহোল্ডারদের ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের সক্ষমতার সঙ্গে এসব সম্পদের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের অর্থ আটকে থাকলে তা কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও তারল্য পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রাইম ইসলামী লাইফের বিনিয়োগ কাঠামোর আরেকটি বড় সমস্যা সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের ঘাটতি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা।
বীমা বিধিমালা অনুযায়ী, কোম্পানির মোট সম্পদের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রাইম ইসলামী লাইফের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৮২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
এই সম্পদের ৩০ শতাংশ হিসাবে সরকারি সিকিউরিটিজে কোম্পানিটির ন্যূনতম ২৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। ফলে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
অর্থাৎ যে পরিমাণ সম্পদ সরকারি সিকিউরিটিজে থাকার কথা, তার তুলনায় কোম্পানিটির বিনিয়োগ অনেক কম। জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি সিকিউরিটিজকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এ খাতে নির্ধারিত সীমার তুলনায় বড় ঘাটতি নিরীক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
শুধু সরকারি সিকিউরিটিজেই নয়, ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের’ ক্ষেত্রেও আইডিআরএর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে প্রাইম ইসলামী লাইফ।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিরো কুপন বন্ড, পিএফআইর স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ, স্টার্লিং গ্রুপের বিনিয়োগসহ অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৮৭ কোটি ৮০ লাখ ৪৪ হাজার ৯০৭ টাকা।
আইডিআরএর বিধিমালা অনুযায়ী, এ খাতে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যায়। কিন্তু প্রাইম ইসলামী লাইফের বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি।
অর্থাৎ কোম্পানির বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে একদিকে সরকারি সিকিউরিটিজে বড় ঘাটতি রয়েছে, অন্যদিকে অন্য একটি অনুমোদিত বিনিয়োগ শ্রেণিতে নির্ধারিত সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত অর্থ রাখা হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ বিষয়টিও নিয়ন্ত্রক বিধি পরিপালনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রাইম ইসলামী লাইফের বিনিয়োগের মধ্যে বাংলালায়নের ১০ শতাংশ কনভার্টিবল জিরো কুপন বন্ডও রয়েছে। নিরীক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, এ বন্ডে প্রায় চার কোটি টাকা বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে জমা মুনাফা রয়েছে তিন কোটি ছয় লাখ টাকা।
তবে বন্ডটির মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও এখনো অর্থ আদায় হয়নি। ফলে এই বিনিয়োগ থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে বলে নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন।
একটি বিনিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় অর্থ আদায় না হলে সেটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনে। বিশেষ করে জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পলিসিহোল্ডারদের দায় পরিশোধের জন্য বিনিয়োগকৃত অর্থ সময়মতো ফেরত পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
স্টার্লিং গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে প্রাইম ইসলামী লাইফের প্রায় ১৫ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ রয়েছে। এই অর্থও ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের অর্থ আদায়ের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চারটি দেওয়ানি আবেদন চলমান রয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় পার হলেও বিনিয়োগ করা অর্থ পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
এতে কোম্পানিটির বিনিয়োগের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে থাকার চিত্রও সামনে এসেছে।
প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষকরা। কোম্পানিটি জীবন বীমা দায়ের অ্যাকচুয়ারিয়াল তদন্ত ও মূল্যায়ন করেনি।
২০১৮ সালের ২৯ মে জারি করা এসআরও ১৬১-আইন/২০১৮-এর ৩০(১) ধারায় এ ধরনের মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোম্পানিটি সেই বাধ্যবাধকতা পূরণ করেনি।
জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পলিসিহোল্ডারদের কত টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে, তার হিসাব নির্ধারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে এ মূল্যায়ন না হওয়ার বিষয়টি কোম্পানির ভবিষ্যৎ দায় ও আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
কোম্পানিটির সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পাওনা রয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা লভ্যাংশ ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী।
অর্থাৎ, প্রায় সাত বছর ধরে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য লভ্যাংশ কোম্পানির হিসাবে আটকে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পাওনা আদায় না হওয়ায় কোম্পানির নগদ প্রবাহ ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রাইম ইসলামী লাইফের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগেও লোকসানের চিত্র পাওয়া গেছে। নিরীক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানিটির আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
আনরিয়েলাইজড লোকসান সাধারণত বিনিয়োগ করা সিকিউরিটিজের বাজারমূল্য কমে যাওয়ার কারণে হিসাবভুক্ত হয়। এসব বিনিয়োগ ভবিষ্যতে বিক্রি করা হলে প্রকৃত লাভ বা লোকসানের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
তবে সামগ্রিক বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে দীর্ঘদিনের অনাদায়ী অর্থ, অনিশ্চিত বিনিয়োগ এবং পুঁজিবাজারের লোকসান—সব মিলিয়ে কোম্পানিটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রাইম ইসলামী লাইফের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্পন্সর ও পরিচালকদের মালিকানা ৩৬ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৬৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, এই মালিকানা কাঠামো আইডিআরএর নির্ধারিত অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অর্থাৎ, আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডিং কাঠামোতেও নিয়ন্ত্রক বিধিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রাইম ইসলামী লাইফের ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষার পর পাওয়া তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে কোম্পানিটির বড় অঙ্কের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগে ঘাটতি রয়েছে। আবার অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর পাশাপাশি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া বন্ডের অর্থ আদায় অনিশ্চিত, স্টার্লিং গ্রুপের বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী এবং সাবসিডিয়ারি থেকে পাওনা লভ্যাংশও আদায় হয়নি। জীবন বীমা দায়ের অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন না করার বিষয়টিও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসেছে।
প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল ধরেননি। 
২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষায় প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, বিধি পরিপালন এবং ভবিষ্যৎ দায় ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিশেষ করে জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পলিসিহোল্ডারদের অর্থের নিরাপত্তা ও সময়মতো দাবি পরিশোধের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘদিনের অনাদায়ী বিনিয়োগ, বাধ্যতামূলক সরকারি সিকিউরিটিজে ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক সীমা অতিক্রম করে বিনিয়োগের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনছে।
নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসা এসব বিষয় কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি জীবন বীমা খাতে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক বিধি পরিপালনের বিষয়টিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।