মেরামতে অবহেলা ও অদক্ষতা
যান্ত্রিক বিভাগের খামখেয়ালিতেই প্রতিবছর ডুবছে রেলওয়ে
ছবি সংগৃহীত
প্রতিনিয়ত শিডিউল বিপর্যয়, মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল আর শত শত কোটি টাকার লোকসান—বাংলাদেশ রেলওয়ের এই নিত্যদিনের সংকটের নেপথ্যে উঠে এসেছে যান্ত্রিক বিভাগের চরম গাফিলতি ও অদক্ষতা। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নিম্নমানের ইঞ্জিন মেরামতের কারণে প্রতিবছরই রেল খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। নতুন ইঞ্জিন কেনায় হাজার কোটি টাকা ঢালা হলেও, যান্ত্রিক বিভাগের অদক্ষতার কারণে পুরোনো বা হালকা ত্রুটি থাকা ইঞ্জিনগুলোও দ্রুত অচল হয়ে পড়ছে। নিয়মিত তদারকি ও অভিজ্ঞতার ঘাটতির চরম খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের, আর ক্রমাগত ধসের দিকে ধাবিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই পরিবহন সংস্থা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাকশন মোটরগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে সচল বা পুনর্নির্মাণ করার মতো আধুনিক অবকাঠামো রেলের যান্ত্রিক বিভাগের নেই। ট্রেনের লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন), কোচ (বগি) মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রধান দায়িত্বে নিয়োজিত থাকলেও সাম্ক্রতিক বছরগুলোয় রেলের যান্ত্রিক বিভাগের বড় ধরনের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা স্কষ্ট হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে ট্রাকশন মোটর মেরামত করার মতো সক্ষমতা এবং দক্ষ জনবল নেই বলে দ্বায় এড়ানোর চেষ্টা করে যান্ত্রিক বিভাগ। এদিকে রেলের উন্নয়নে প্রতিবছর সরকার থেকে বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ নিলেও ইঞ্জিন মেরামত ও ট্রাকশন মেরামত করার সক্ষমতা না থাকায় যান্ত্রিক বিভাগের গাফিলতি, কর্মে অবহেলা ও কর্মকর্তাদের কমিশন বাণিজ্য হিসেবে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিপুল বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ এই সংকট সমাধানে কেন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে—এটা সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ট্রাকশন মোটর মেরামতের প্রাথমিক কার্যক্রম, মোটর খোলা, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় মেরামত, কয়েল প্রস্তুতকরণ ও প্যাকিংসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজ সীমিত পরিসরে সৈয়দপুর রেলের নিজস্ব কারখানায় সম্কন্ন করা হয়।
রেলের যান্ত্রিক বিভাগের দুর্বলতা ঢাকতে সম্ক্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পার্বতীপুর প্রধান নির্বাহীসহ (কেলোকা) রেলের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরস্কর যোগসাজশে ট্রাকশন মোটর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য ‘শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রেলের একাধিক সূত্র শেয়ার বিজকে নিশ্চিত করেছেন, ট্রাকশন মোটর মেরামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচ ালনার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে পার্বতীপুর (কেলোকার) ফায়ার ফাইটিং অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ ভবনের ‘ইনওয়ার্ড ওয়ারহাউস’ গোডাউনের একটি কক্ষ (৬০ ফুট ঢ ৪৫ ফুট) ‘শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’কে ভাড়া প্রদানের জন্য কেলোকার নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং উক্ত কমিটি বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্কত্তি নীতিমালা-২০২০ অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ ও অনুমোদনের জন্য রেলভবনে এক নথি উপস্থাপনসহ দপ্তরে প্রেরণের নির্দেশ এবং অনুরোধ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান শেয়ার বিজকে জানান, রেলের বড় ঘাটতি লোকোমোটিভের। ইঞ্জিনগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। ৬৩ শতাংশ লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এখন ট্রাকশন মোটর মেরামত করতে থার্ড পার্টিকে দিচ্ছে এখানে অর্থনৈতিক সম্কর্ক জড়িত রয়েছে। আর রেলের অধিকাংশ লোকোমোটিভের যেহেতু অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে সুতরাং থার্ড পার্টিকে দিয়ে মেরামত করে কতদিন পর্যন্ত চলানো যাবে সে হিসাব করতে হবে। আর এটা কোনোভাবেই লাভজনক হয় না।
অধ্যাপক হাদিউজ্জামান আরও বলেন, প্রথমে এই প্রশ্ন করা উচিত যে ট্রাকশন মোটর মেরামত করে লোকোমোটিভ চালাব—এটা টেকসই হবে কিনা? হবে না। মেরামত করার জন্য একটা খরচ আছে। আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাওয়া জিনিস জোড়াতালি দিয়ে আদতে চালানো যাবে?
তিনি আরও বলেন, রেলের যান্ত্রিক বিভাগের অদক্ষতার পাশাপাশি রেলের যারা নীতিনির্ধারক আছেন বা ছিলেন অধিকাংশ সময় তারা রেলের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সম্ক্রসারণে মনোযোগ অনেক বেশি। রেল তো পরিচালনার বিষয়, সেবা দেওয়ার বিষয়। সেখানে লোকোমোটিভ কোচ এটার অগ্রাধিকার দেখিনি। বড় বড় প্রকল্প নিতে দেখেছি নতুন রেললাইন সম্ক্রসারণের। রেল চালানোর জন্য ইঞ্জিন ও কোচ দরকার সেসব প্রকল্প সময়মতো নেয়নি। ফলে এখানে লোকোমোটিভের ব্যাপক শূন্যতা রয়েছে। মূলত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা ছিলেন তাদের ব্যর্থতা রয়েছে।
যান্ত্রিক বিভাগের দুর্নীতি-অনিয়ম এসব কারণে
রেল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা কেনাকাটায় আগ্রহী উল্লেখ করে হাদিউজ্জামান আরও বলেন, কিন্তু এটাকে রক্ষণাবেক্ষণ করা এখানেও যান্ত্রিক বিভাগের ঘাটতি ও অবহেলা রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণেরও সময়সীমা আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ৬৩ শতাংশ ইঞ্জিনের তো আয়ুষ্কালই নেই। এটাকে জোড়াতালি দিয়ে চালানো যাবে না।
থার্ড পার্টিকে দিয়ে ট্রাকশন মোটর মেরামত করে ইঞ্জিন চালালে টেকসই হবে কি না? এর পেছনে যে ব্যয় হবে এটার ফিজিবিলিটি স্টাডি করে নেওয়া উচিত। নতুবা রেলের ব্যয় বৃদ্ধি হতেই থাকবে। বারবার মেরামত করতে হবে, এটা স্থায়ী কোনো সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন ড. হাদিউজ্জামান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টোক) ফকির মো. মহিউদ্দীন শেয়ার বিজকে জানান, শ্রীজা মেটালকে এখনো ভাড়া দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ এখানে শ্রীজা মেটাল যে ট্রাকশন মোটর মেরামত করে সেটা মূলত বাইরে করে। পরবর্তীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পার্বতীপুর নিয়ে আসে। যেহেতু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কয়েকটা দিন অপেক্ষা করা লাগে সে কারণে জায়গার দরকার পড়ে। তো এই অপেক্ষা করার সময়টুকুর জন্য আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি একটা চার্জ নির্ধারণ করা এবং চার্জ নির্ধারণ করার জন্য একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। কমিটি এখনো কাজ করছে, কমিটি কোনো মন্তব্য দেয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে প্রধান নির্বাহী (কেলোকা) পার্বতীপুরকে একাধিকবার ফোন কল এবং হোয়াটঅ্যাপে বার্তা দিলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে রেল সূত্রে জানা যায়, রেলে বর্তমানে লোকোমোটিভের তীব্র সংকট চলছে। পূর্বাঞ্চলে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট) মিটার-গেজ ইঞ্জিনের অভাব সবচেয়ে বেশি। ইঞ্জিনের অভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহনে রেলের অংশীদারিত্ব কমে মাত্র ৩ শতাংশে নেমে এসেছে; যা পণ্য পরিবহনে বড় বিপর্যয় তৈরি করেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, যান্ত্রিক বিভাগের অদক্ষতার কারণে ইঞ্জিন মেরামত না হওয়ায় এসব সংকট আরও তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানান, বছরের পর বছর ধরে চলা অপরিকল্পিত পরিকল্পনা, যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং কর্মকর্তাদের দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা এর জন্য দায়ী।
রেল সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা (কেলোকা) থেকে মেরামত করে বের করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অনেক ইঞ্জিন আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি গত ৩-৪ বছরের মধ্যে কেনা নতুন ইঞ্জিনও বিকল হচ্ছে; যা যান্ত্রিক বিভাগের নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার এবং তদারকির অভাব বলে মন্তব্য করেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যান্ত্রিক বিভাগের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানান, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে কেনা ডেমু ট্রেনগুলোর নকশাগত ও যান্ত্রিক ত্রুটির সমাধান করতে পারেনি রেলের যান্ত্রিক বিভাগ। যান্ত্রিক বিভাগের অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে দীর্ঘদিন ডেমু ট্রেনের মতো আধুনিক ট্রেন অকেজো পড়ে রয়েছে; যা রেলের ইতিহাসের অন্যতম বড় অপচয়।
সঠিক সময়ে খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি ও সংগ্রহ করতে না পারার কারণে অর্ধেকেরও বেশি নতুন ইঞ্জিন (৩০০০) সিরিজের মতো আধুনিক ইঞ্জিন) কারখানায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
রেলের ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় সাধারণত ২৫ বছর। কিন্তু সাম্ক্রতিক বছরগুলোয় উন্নত প্রযুক্তির ইঞ্জিন বহরে যুক্ত করা হলেও তিন থেকে চার বছরের মধ্যে সেসব ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কার ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। রেলের যান্ত্রিক বিভাগের ব্যর্থতা ও অদক্ষতা সর্বত্র ফুটে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ের দুটি কারখানায় যন্ত্রাংশ তৈরির নামে শতকোটি টাকার বরাদ্দ নিলেও বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানিও করা হয়। যে জন্য রেলকে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যন্ত্রাংশ কাগজে-কলমে স্টোরে সংরক্ষিত রাখা হলেও বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না বলে কেউ কেউ অভিযোগ করেন।
এদিকে যান্ত্রিক বিভাগের গাফিলতির কারণে রেলের ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভের সংকট দীর্ঘদিনের। বর্তমানে অর্ধেকেরও বেশি ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয়সহ ট্রেন বাতিল দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে এই সংকট কাটাতে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এবং এক ধরনের দায় এড়ানোর সংস্কৃতিকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তবে চরম সংকট ও বাজেট সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিভাগটি অভ্যন্তরীণভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে তার তিনটি বিদ্যমান রেলওয়ে ওয়ার্কশপের আধুনিকীকরণ এবং ট্রেনের কোচের দেশীয় সংযোজন পুনরায় শুরু করার জন্য ২ হাজার কোটি টাকার একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন ফ্যাক্টরি এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুর লোকোমোটিভ কারখানাকে আধুনিক রূপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
রেল কর্মকর্তাদের মতে, সৈয়দপুর এবং পাহাড়তলী কারখানা দুটি প্রধানত কোচ ও ওয়াগনের মেরামত এবং ওভারহলিংয়ের কাজ করে থাকে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্বতীপুর লোকোমোটিভ ফ্যাক্টরিটি ইঞ্জিন মেরামত ও ওভারহলিংয়ে বিশেষায়িত। এই দুটি পুরোনো কারখানায় ১ হাজার ২০০টিরও বেশি যন্ত্রপাতি রয়েছে; যার অর্ধেকেরও বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ এবং মূলত অকেজো।
রেল সূত্রে জানা যায়, এই ওয়ার্কশপগুলোর বর্তমান ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। বর্তমান চাহিদা মেটাতে প্রতিটি কারখানার দৈনিক অন্তত ছয়টি কোচ মেরামত করার ক্ষমতা প্রয়োজন। তবে সৈয়দপুর কারখানাটি দৈনিক গড়ে চারটি ইউনিট বা দুটি কোচ মেরামত করতে পারে। অন্যদিকে পাহাড়তলীতে দৈনিক তিনটি ইউনিট বা দেড়টি কোচ মেরামত করা হয়। রেলওয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, যান্ত্রিক বিভাগের এই ব্যর্থতাগুলোর পেছনে শুধু তাদের অদক্ষতাই দায়ী নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত নতুন ট্র্যাক নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও ইঞ্জিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত বাজেট না দেওয়া একটা বড় কারণ।