কমছে আমদানি
রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে বেনাপোল কাস্টমসে কড়াকড়ি
ছবি সংগৃহীত
রাজস্ব ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণা ঠেকাতে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টম হাউসে কড়াকড়ি জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহজনক পণ্যচালানের শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, বিশেষ অভিযান এবং আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের চালানে অতিরিক্ত বা ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য শনাক্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কাস্টমসের আইআরএম টিম। এতে একেকটি চালান পরীক্ষা ও খালাসে তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাস্টমসের এই কঠোর অবস্থানে একদিকে রাজস্ব ফাঁকির বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ছে, অন্যদিকে বৈধ আমদানিকারকদের পণ্য খালাসে বিলম্বের অভিযোগও উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের পাশাপাশি বৈধ আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করার বিষয়েও কাস্টমসকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বেনাপোল কাস্টম হাউসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়। একই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির অভিযোগে ১৪টি চালান আটক করা হয়। এসব চালানে প্রায় ৩০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির বিষয় শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস।
রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো লিংক ইন্টারন্যাশনাল, রয়েল এন্টারপ্রাইজ, করিম অ্যান্ড সন্স এবং হুদা ইন্টারন্যাশনাল।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বন্ডের কাগজপত্র, গার্মেন্ট ও কেমিক্যালজাতীয় পণ্যের চালানে তুলনামূলকভাবে বেশি অনিয়মের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব চালানের ক্ষেত্রে ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্য, পরিমাণ ও পণ্যের ধরন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান, জয়েন্ট কমিশনার মো. শরফুদ্দিন মিঞা এবং আইআরএম টিমের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সামপ্রতিক সময়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালান শনাক্ত, পণ্য পরীক্ষা এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে রাজস্ব ফাঁকির বেশ কয়েকটি চেষ্টা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। গত তিন মাসে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির বিষয় শনাক্ত ও রাজস্ব আদায় করা হয়েছে বলেও দাবি কাস্টমসের।
বেনাপোল কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্কাদক বদরুজ্জামান বনি বলেন, আইআরএম টিম যেসব পণ্যচালান পরীক্ষা করে সেগুলোর শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করে পণ্য খালাস দেওয়া হয়। এতে সময় কিছুটা বেশি লাগছে।
রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে কড়াকড়ির পাশাপাশি বেনাপোল দিয়ে পণ্য আমদানিও কমেছে। কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সময়ে আমদানি কমেছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৯ মেট্রিক টন।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
একই সময়ে বেনাপোল দিয়ে পণ্য আমদানিও আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন কমেছে।
আমদানি ও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির পরও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউসের জন্য ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগের অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা ৭০২ কোটি টাকা কম।
তবে গত অর্থবছরে যেখানে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, সেখানে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে গত বছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা বন্ধের পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীদের দ্রুত পণ্য খালাসের সুযোগ দিতে হবে। সে লক্ষ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ ও সন্দেহজনক চালানকে আলাদা করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক চালান শতভাগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈধ পণ্যচালান দ্রুত খালাসের বিষয়টি কাস্টমসের অগ্রাধিকার। তবে রাজস্ব ফাঁকি বা ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য থাকার সন্দেহ হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী পরীক্ষা সম্কন্ন করেই পণ্য খালাস দেওয়া হবে।