আশুলিয়ায় ঝুটের পাপোশে বদলে যাচ্ছে জীবন
ছবি সংগৃহীত
পোশাক কারখানার ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড় এখন আর বর্জ্য নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের আয়ের উৎস। সাভারের আশুলিয়ার কবিরপুর এলাকায় পোশাক কারখানার ঝুট কাপড় দিয়ে পাপোশ, কার্পেটসহ নানা ধরনের গৃহসামগ্রী তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব ছোট ছোট কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে বেকার যুবক যুবতীদের। পাশাপাশি ঘরে বসে কাজ করছেন অনেক নারীও।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ছোট বড় সহস্রাধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় পোশাক তৈরির পর বিপুল পরিমাণ কাপড়ের টুকরা বা ঝুট জমে থাকে। একসময় এসব ঝুট ফেলে দেওয়া হতো কিংবা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে সেই অব্যবহূত কাপড়ই কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে বাহারি নকশা ও রঙের পাপোশ, কার্পেটসহ মেঝেতে ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রী।
কবিরপুর এলাকায় একসময় অনেক মানুষ বেকার জীবনযাপন করলেও পাপোশ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠার পর তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। অনেকে কারখানায় কাজ শিখে এখন বাড়িতে বসেই পাপোশ তৈরি করছেন। এতে সংসারের আয় বাড়ার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজনীয় খরচও মেটাতে পারছেন তারা।
সরেজমিনে কবিরপুর এলাকার পাপোশ তৈরির কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিভিন্ন রঙের কাপড়ের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে নকশি বুনে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন আকারের পাপোশ । অনেকেই পড়াশোনা বা অন্য কাজের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য প্রতি পিস হিসেবে মজুরিতে কাজ করছেন। গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে নারীরাও ঘরে বসে এ কাজ করছেন।
উদ্যোক্তাদের হিসাবে, পোশাক কারখানা থেকে প্রতি টন ঝুট কাপড় গড়ে ২৭ হাজার টাকায় কিনতে হয়। পাপোশের আকার, আয়তন ও নকশাভেদে কারিগরদের প্রতি পিস ৮ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়। আনুষঙ্গিক খরচসহ এক টন ঝুট কাপড় থেকে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি পাপোশ তৈরি করা যায়। এসব পাপোশ বিক্রি করে প্রতি টনে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মুনাফা থাকে। একজন দক্ষ কারিগর প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
কবিরপুরে পাপোশ তৈরির উদ্যোক্তা শামীম, একসময় পোশাক কারখানার টুকরা কাপড় স্তূপ হয়ে থাকত। তিনি দরিদ্রতার কারণে একসময় ভারতে গিয়ে এসব কাপড় দিয়ে পাপোশ তৈরির কারখানায় কাজ করেন। তারপর নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে কাজ শুরু করেন। এখন নিজেই কারখানা গড়ে তুলেছেন আশুলিয়াতে, কারণ ঠাকুরগাঁও জেলায় গার্মেন্ট নাই, ঢাকা থেকে ঝুট কিনে পরিবহন শ্রমিক খরচ অনেক বেশি পরে যায় তাই শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বিভিন্ন এলাকায় এই কারখানা গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে কবিরপুর এলাকায়। তিনি আরও বলেন, প্রথমে পাঁচটি তাঁত দিয়ে কারখানা শুরু করি। দক্ষ কারিগর না থাকায় আশপাশের বেকার যুবকদের ডেকে এনে কাজ শেখাই। শুরুতে নোংরা-ময়লা কাপড় দেখে অনেকেই কাজ করতে চাইত না। পরে প্রতিদিনের আয় হাতে পেয়ে তারা উৎসাহী হয়ে ওঠে।
বর্তমানে শামীম কারখানায় ২৫টি তাঁত রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩৫০টির বেশি পাপোশ তৈরি হয়। কারিগর, সহকারী ও অন্যান্য কর্মচারী মিলিয়ে সেখানে প্রায় ৫০ জন কাজ করছেন। তাদের প্রত্যেকে নকশা ও কাজের ধরন অনুযায়ী দৈনিক গড়ে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করেন।
শামীম আরও বলেন, এই কারখানার মাধ্যমে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি নারীদেরও ঘরে বসে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আনোয়ার হোসেন বলেন, বেকাররা স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এ শিল্প আরও বড় পরিসরে গড়ে তোলা সম্ভব।
পাশাপাশি কারখানের কারিগর মানিক মিয়া বলেন, কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে কাজ শিখেছি। এখন এই কাজ করে পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি পরিবারের ছোটখাটো চাহিদা মেটাতে পারছি। হাতখরচের জন্য বাবার কাছে টাকা চাইতে হয় না। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মজুরি বাড়ানো প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, ঝুট কাপড় পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর চাপ কমছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার সম্ক্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে আশুলিয়ার এই ক্ষুদ্র কুটির শিল্প আরও বিকশিত হতে পারবে,যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।