সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:৪৬, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাত বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি 

২৫৪৯ গ্রাহকের দাবি পরিশোধ

২৫৪৯ গ্রাহকের দাবি পরিশোধ

ছবি সংগৃহীত

বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এর অংশ হিসেবে সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে পাওয়া অর্থ থেকে ২ হাজার ৫৪৯ জন পলিসিধারীকে মোট ১৪ কোটি ৫১ লাখ ৩ হাজার ১৪৬ টাকা ৫৮ পয়সা বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে।
পলিসিধারীদের দীর্ঘদিনের পাওনা দ্রুত পরিশোধ এবং বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিশেষ উদ্যোগের আওতায় সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের মধ্যে মোট ৯৪টি চেক বিতরণ করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর দিলকুশায় আইডিআরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে পলিসিধারীদের হাতে বীমা দাবির চেক তুলে দেন আইডিআরের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।
চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আইডিআরের চেয়ারম্যান বলেন, পলিসিধারীদের ন্যায্য দাবি সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বীমা খাতে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য দাবি নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, পলিসিধারীরা যাতে তাদের প্রাপ্য অর্থ নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকেন, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আইডিআরএ মনে করছে, আটকে থাকা বীমা দাবি পরিশোধের মাধ্যমে একদিকে পলিসিধারীদের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থাও বাড়বে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বা ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দাবি পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আইডিআরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের উদ্যোগে সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির পলিসিধারীদের দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো—বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করা হয়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির। প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৩৫০ জন গ্রাহককে মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ ৩২ হাজার ১৬৫ টাকা ৫৮ পয়সা পরিশোধ করা হয়েছে।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫২৮ জন গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৯ টাকা। পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৬২৪ জন গ্রাহক পেয়েছেন ১ কোটি ৯৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ টাকা।
অন্যদিকে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৫ জন গ্রাহককে ১০ লাখ ৬৬ হাজার ১৯১ টাকা, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০ জন গ্রাহককে ৫ লাখ ২১ হাজার ২৬৬ টাকা, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আটজন গ্রাহককে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮২৬ টাকা এবং গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চারজন গ্রাহককে ২ লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
আইডিআরের হিসাবে, সাতটি কোম্পানির মধ্যে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহকদেরই সবচেয়ে বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৩৫০ জন গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এরপর ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ৫২৮ জন গ্রাহককে
 প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং পদ্মা ইসলামী লাইফের ৬২৪ জন গ্রাহককে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হোমল্যান্ড লাইফের ১৫ জন গ্রাহককে ১০ লাখ ৬৬ হাজার ১৯১ টাকা, সানফ্লাওয়ার লাইফের ২০ জন গ্রাহককে ৫ লাখ ২১ হাজার ২৬৬ টাকা, বায়রা লাইফের আটজন গ্রাহককে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮২৬ টাকা এবং গোল্ডেন লাইফের চারজন গ্রাহককে ২ লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ টাকা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৯৪টি চেকের বিপরীতে সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহককে ১৪ কোটি ৫১ লাখ ৩ হাজার ১৪৬ টাকা ৫৮ পয়সা বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। দেশের বীমা খাতে গ্রাহকদের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো বীমা দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কিংবা নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলেও অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে গ্রাহকদের মধ্যে বীমা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পুরো খাতের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়।
এ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে আটকে থাকা দাবি নিষ্পত্তিতে জোর দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইডিআরের এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কিছু গ্রাহক তাদের প্রাপ্য অর্থ হাতে পেয়েছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, বীমা খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু নতুন পলিসি বিক্রি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে গ্রাহকের দাবি যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দাবি নিষ্পত্তির অভিজ্ঞতাই একজন গ্রাহকের কাছে বীমা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার অন্যতম প্রধান সূচক।
বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আরও অনেক পলিসিধারীর অর্থ পাওয়ার পথ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পাশাপাশি দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়লে দেশের বীমা খাতেও গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হতে পারে।