বিস্ফোরক অধিদপ্তর
অতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডেই ৯ শ্রমিকের মৃত্যু
ছবি সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর। প্রাথমিকভাবে এই বিষাক্ত গ্যাসের কারণেই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা কারও অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শনিবার সকালে দুর্ঘটনাকবলিত ইয়ার্ড ও জাহাজ পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানান।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা। আমাদের সমন্বিত কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, জাহাজ থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড অপসারণ করা হবে।
বিষাক্ত গ্যাস অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, হাইড্রোজেন সালফাইড সাধারণত পানিতে দ্রবীভূত হয়। এ কারণে সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পানি দিয়ে জাহাজের ভেতরের অংশ ধুয়ে গ্যাস অপসারণ করা হবে।
শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরীক্ষায় জাহাজটিতে স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ১১ সদস্যের, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নয় সদস্যের এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসবিআর) পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, এর সঙ্গে কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখতে কমিটিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতেও বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, আমরা গতকাল একদম শুরু থেকেই রেসপন্স করেছি। গতকাল আমাদের মূল কনসার্ন ছিল আহতদের উদ্ধার করা। কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটা আমরা একটা ধারণা নিয়ে ব্যবস্থা নেব। এখন পর্যন্ত মামলা রেকর্ড হয়নি, প্রক্রিয়াধীন আছে।
এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুরোনো একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার সময় জাহাজের বদ্ধ অংশে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্কর্শে এসে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে ৩৪ জন শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে জাহাজের ভেতরে থাকা দুই শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধারে অন্য শ্রমিকেরা এগিয়ে গেলে তারাও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। পরে ৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন—মনসুর আহমেদ, নাসির উদ্দিন, সানি দাস, পলাশ দাস, রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, খোকন মিয়া, আব্দুল আলিম সুজন ও ১৭ বছর বয়সি মতিউর রহমান সাজ্জাদ। নিহত মনসুর ও নাসির সম্কর্কে দুই ভাই।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কোন ধরনের গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্কূর্ণ গ্যাসমুক্ত করার নিয়ম রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের কিছু ট্যাংকে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত গ্যাস থাকতে পারে। গ্যাসমুক্ত না করে জাহাজ কাটার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেন।
তবে গতকাল শনিবার বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জাহাজে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এখন এই গ্যাসের উৎস, কীভাবে এটি জাহাজের বদ্ধ অংশে জমেছিল এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।