আধুনিক পয়োনিষ্কাশনের দ্বার উন্মোচনের চেষ্টা
ছবি সংগৃহীত
একটি নগর শুধু পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, তার সুস্থতা নির্ভর করে ব্যবহূত পানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনাতেও। চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের পয়োনিষ্কাশন সংকট, অপরিকল্পিত বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ দূষণের চাপ কমাতে এবার নতুন দিগন্তের পথে হাঁটছে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম ওয়াসা। নগরের উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টে দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার সক্ষমতার অত্যাধুনিক পয়োশোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু শোধনাগার নয়, এর সঙ্গে গড়ে উঠবে বিস্তৃত বর্জ্য পানি নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য পানি সংগ্রহ করে তা শোধনাগারে নিয়ে এসে পরিশোধনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার গেল ১২ আগস্ট প্রাথমিক বাজার-সম্কৃক্ততা সভার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন স্যানিটেশন প্রকল্প ফর নর্থ কাট্টলী ক্যাচমেন্ট বাস্তবায়নে দুটি বড় প্যাকেজে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য ডেভেলপমেন্ট (এএফডি) এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।
শুধু শোধনাগার নয়, পুরো ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: প্রথম প্যাকেজে নির্মাণ করা হবে দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার ক্ষমতার পয়োশোধনাগার। নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নির্মাণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, পরীক্ষা এবং চালু করার কাজ থাকবে এর আওতায়। দ্বিতীয় প্যাকেজে গড়ে তোলা হবে উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টের বর্জ্য পানি নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। অর্থাৎ প্রকল্পের লক্ষ্য কেবল একটি শোধনাগার দাঁড় করানো নয়; বরং নগরীর বর্জ্য পানি সংগ্রহ, পরিবহন, শোধন ও নিরাপদ নিষ্কাশনের একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র তৈরি করা। এখানেই প্রকল্পটির বিশেষত্ব। কারণ শোধনাগার থাকলেও যদি বর্জ্য পানি সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। উত্তর কাট্টলী প্রকল্পে তাই শোধনাগারের পাশাপাশি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
যে কারণে নজর উত্তর কাট্টলীতে: দ্রুত সম্ক্রসারিত হচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগর। বাড়ছে জনবসতি, আবাসিক এলাকা ও বর্জ্য পানির পরিমাণ। কিন্তু নগরের সব এলাকায় এখনো আধুনিক পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে সেপটিক ট্যাংক, খোলা নালা কিংবা অপরিকল্পিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে। অপরিশোধিত বর্জ্য পানি খাল, জলাশয় কিংবা অন্যান্য জলাধারে পৌঁছে গেলে দূষণের ঝুঁকি বাড়ে। উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টে পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা চালু হলে এই ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দরপত্রের আগেই বাজারের কথা শুনছে ওয়াসা: বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে দরপত্র তৈরির আগেই বাজারের সক্ষমতা ও সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের মতামত জানা গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় সম্ভাব্য ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আগাম আলোচনা করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ২০ আগস্ট চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন সদর দপ্তরের দ্বিতীয় তলার সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে আর্লি মার্কেট এনগেজমেন্ট (ইএমই) সভা। সভাটি দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত চলবে। সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের অনলাইনেও যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে। এ সভার মাধ্যমে সম্ভাব্য দরদাতাদের কাছ থেকে প্রকল্পের কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন বিষয়ে মতামত, প্রশ্ন, পরামর্শ ও সুপারিশ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা জানতে একটি মার্কেট ইনফরমেশন ফরমও প্রস্তুত করা হয়েছে।
বদলে যেতে পারে চট্টগ্রামের স্যানিটেশন চিত্র: চট্টগ্রামের জন্য এ প্রকল্পের গুরুত্ব কেবল উত্তর কাট্টলী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি নগরীর অন্যান্য ক্যাচমেন্টেও আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্ক্রসারণের পথ দেখাতে পারে। দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পানি শোধনের সক্ষমতা এবং তার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বর্জ্য পানি নেটওয়ার্ক দুটিকে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে নগরীর স্যানিটেশন ব্যবস্থায় এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সংযোজন। পরিকল্পিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা শুধু নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণের বিষয়ও। তাই উত্তর কাট্টলী প্রকল্পকে চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।