দুমাসেই পরিবর্তনের হিড়িক
ছবি সংগৃহীত
২১ মে’র এক দুপুরে ঘটা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা হলো প্রজ্ঞাপন। চট্টগ্রাম ওয়াসায় নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন একজন, যাকে কার্যকাল হিসেবে এক বছরের সময় বেঁধে দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এরপর ১ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগমের কাছ থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম। ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছর ধরে মোট আটবার চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি ছিলেন প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ। তাকে ঘিরে ওয়াসায় ছিল নানা অভিযোগের পাহাড়, যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল—নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর কতটা সফলতার সঙ্গে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের হাহাকার দূর করবেন সেলিম জানে আলম। কিন্তু মাত্র দুমাসের মাথায়ই চমৎকার বেশ কিছু উদ্যোগের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার পুরোনো দিনের জঞ্জাল অপসারণ করে উদাহরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব) চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি ও ডুয়েট ছাত্র সংসদের সাবেক এই ভিপি।
খবর নিয়ে জানা যায়, নগরের পতেঙ্গায় দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ১০ কোটি লিটার। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছিল মাত্র চার কোটি লিটার। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন দিনের মধ্যে জটিল সমস্যাটির সমাধানের উদ্যোগ নেন তিনি। তার সিদ্ধান্তে ৬৩ বছর পর প্রথমবারের মতো নগরীর পতেঙ্গা এলাকার তিনটি ওয়ার্ডে পাইপলাইনের মাধ্যমে ওয়াসার সুপেয় পানি পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত হয়। এমন জনগুরুত্বপূর্ণ ইনিংসের মধ্য দিয়ে ওই এলাকাবাসীদের মনে জায়গায় করে নেন তিনি।
ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাইপলাইন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়াসার পানি সরবরাহ সম্ভব হয়নি। উপকূলীয় এসব এলাকার বাসিন্দাদের যে কারণে লবণাক্ত পানি ও সুপেয় পানির সংকট নিয়ে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ৩ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি পাঠান ওয়াসার এমডি। চিঠিতে তিনি কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে পাইপলাইন স্থাপনের অনুমতি চান। গত ১১ আগস্ট বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অপারেশন শাখার একটি পত্র মারফত এ বিষয়ে অনাপত্তি প্রদান করা হয়। অনাপত্তি পত্রে প্রস্তাবিত পাইপলাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে কর্ণফুলী টানেলের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং বিদ্যমান ইউটিলিটিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক উল্লেখ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বোয়ালখালীর ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প থেকে প্রতিদিন অন্তত দুই কোটি লিটার পরিশোধিত পানি পতেঙ্গা এলাকায় সরবরাহ করা হবে।
শুধু বাড়িঘরেই নয়, সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্যও ভাবছেন প্রকৌশলী সেলিম জানে আলম। আগামী ছয় মাসের মধ্যে নগরজুড়ে ২০ থেকে ৩০টি পানির এটিএম বুথ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যেখানে জনগণকে স্বল্পমূল্যে সুপেয় পানি প্রদান করা হবে। আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটার এইড এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার যৌথ উদ্যোগে পানির এসব এটিএম বুথ স্থাপনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এটিএম বুথ থেকে ওয়াসার পানি সংগ্রহ করে ইউভি সিস্টেমে ফ্লিটার করে স্বল্পমূল্যে সুপেয় পানি জনগণকে সরবরাহ করা হবে।
শুধু তা-ই নয়, বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রাম ওয়াসায় গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হতো সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। তবে সময় স্বল্পতার কারণে অনেক মানুষই রয়ে যেত সেবার বাইরে। গ্রাহকদের অভিযোগ ছিল, বিলিং সিস্টেম, লিকেজ, পানির সংকটসহ নানা সমস্যা এই অফিস টাইমের বাইরেও হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে এ যাবৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ। নতুন করে আরও একটি শিফট বাড়ানোর দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। বিষয়টিকে গুরুত্বসহ নেন তিনি। জরুরি ভিত্তিতে ৩৬ জন মিটার পরিদর্শক ও চট্টগ্রাম ওয়াসার ১২ জন কর্মকর্তাকে কর্মশালা করান তিনি। এরপরই চলতি মাস থেকে গ্রাহকসেবায় নতুন করে চালু করে দেন ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আরও একটি শিফট। ফলে চলতি মাস থেকে সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা অবধি কন্ট্রোলরুমের যাবতীয় সেবা পাচ্ছে নগরবাসী। এতে সেবার মান যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষও উপকার পাচ্ছে বেশি।
শুধু তা-ই নয়, পানির বিলিং সিস্টেমে আসছে ডিজিটালাইজড সেবা। পানির বিল পরিশোধে ‘অ্যাপস’ সেবা চালু করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিদ্যমান বিলিং প্রক্রিয়া, বর্তমানে ম্যানুয়ালি পরিচালিত বিভিন্ন সেবা এবং প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসাকে পুরোপুরিভাবে ডিজিটাল সেবাব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনে স্বচ্ছতার মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবার মান উন্নত করতে চান নতুন এমডি। বিলিং সিস্টেম উন্নত হলে গ্রাহক সেবার মানও উন্নত হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ইতিহাসে ১ জুলাই (বুধবার) দিনটি এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে যে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন, নতুন এমডি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অবসান ঘটিয়েছেন। একযোগে মোট ২৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩২ জন কর্মকর্তা এবং ২১০ জন কর্মচারী। কর্মকর্তারা দীর্ঘ ১৩ বছর পর এবং কর্মচারীরা দীর্ঘ ২০ বছর পর এই কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পেলেন। যোগ্যতার এই অনন্য স্বীকৃতি ওয়াসার অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা ও গতিশীলতার সঞ্চার করেছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৬৫ কোটি লিটার। ওয়াসা উৎপাদন করে ৫০ কোটি লিটার, যার মধ্যে আবার পাইপ লিকেজের কারণে প্রতিদিন ৯ কোটি লিটার পানি অপচয় হয়। ফলে নগরবাসীকে প্রতিদিন প্রায় ২৪ কোটি লিটার পানির তীব্র ঘাটতি পোহাতে হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে এবং দৈনিক অতিরিক্ত ১০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন নতুন এমডি। এরই মধ্যে কর্ণফুলী পানি শোধনাগার এলাকায় অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন লিটার পানি শোধনের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য জাইকা বাংলাদেশ অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ তাকাহাশি জুনইকো ও তার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা করেছেন প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম।
একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডস সরকারের সম্কূর্ণ অনুদানে পতেঙ্গার ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে একটি পাইলট প্রকল্প ও প্রি-ফিজিবিলি স্টাডি পরিচালনার জন্য গত রোববার নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের প্রথম সচিব (পানি ও জলবায়ু) ইনজে ক্লাসেনের সঙ্গে তার কার্যালয়ে এক অত্যন্ত ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তরিত হবে।
কেবল প্রশাসনিক সংস্কার বা কারিগরি উন্নয়নই নয়, চট্টগ্রাম ওয়াসাকে এক অনন্য মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সংজ্ঞায় রূপায়িত করেছেন প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম। গত ১৭ জুলাই বিকেল ৪টায় নগরীর বেবি সুপার এলাকার পূর্ব নাসিরাবাদ আব্দুল জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সামপ্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শত শত অসহায় পরিবারের মাঝে তিনি নিজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। এ সময় তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, মানুষের সংকটে পাশে দাঁড়ানোও আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
এর আগে গত ১২ জুলাই বন্যাকবলিত দুর্গত মানুষের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে চট্টগ্রাম ওয়াসার পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকার আর্থিক অনুদানের পে-অর্ডার হস্তান্তর করেন তিনি, যা সর্বমহলে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
এসডিজি অর্জনে জনবান্ধব পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা এবং পরিচালন ব্যয় কমিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করার যে বলিষ্ঠ অঙ্গীকার নিয়ে প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম তার যাত্রা শুরু করেছিলেন, মাত্র ৫০ দিনের খতিয়ানেই তার সফল প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে চট্টগ্রামবাসী। চার দশকের লড়াকু অভিজ্ঞতা এবং ২৮ বছরের পেশাদার টেকনিক্যাল প্রজ্ঞার মেলবন্ধনে চট্টগ্রাম ওয়াসা এখন আর কোনো স্থবির সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি এখন গ্রাহকসেবা ও মানবিকতার এক আলোকবর্তিকা। নগরবাসীর প্রত্যাশা-কথা নয়, কাজের মাধ্যমে পানির অপর নাম যে জীবন, তা আবারও সত্য প্রমাণিত হবে এই সুযোগ্য কান্ডারির হাত ধরেই।