সংকট কাটাতে ৩,৫০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ছে পাঁচ ব্যাংক
বিএসইসির অনুমোদন
ছবি সংগৃহীত
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি এবং ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের চাপের মধ্যে ব্যাংক খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বন্ডের মাধ্যমে নতুন করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে পাঁচ ব্যাংককে মোট ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো—ওয়ান ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া। এসব ব্যাংক ভিন্ন মেয়াদ, কাঠামো ও উদ্দেশ্যে বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকগুলোর ব্যাসেল-৩ কাঠামোর আওতায় টায়ার-২ মূলধন শক্তিশালী করতে ব্যবহূত হবে। পাশাপাশি সবুজ অর্থায়ন ও টেকসই প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্যও অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচ ব্যাংকের বন্ড অনুমোদনের তথ্য জানানো হয়েছে।
বিএসইসির অনুমোদন অনুযায়ী, ওয়ান ব্যাংক ৪০০ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক ৮০০ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকা, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকা এবং ব্যাংক এশিয়া ৮০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করবে।
এর মধ্যে ওয়ান ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা হবে। এসব বন্ডের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে রেফারেন্স হার যোগ ৩ শতাংশ হিসেবে।
ব্যাংকগুলোর জন্য টায়ার-২ মূলধন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ব্যাংকের সামগ্রিক মূলধন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় অতিরিক্ত আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করে। ফলে বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ ব্যাংকগুলোর মূলধন ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের বন্ডের কাঠামোতে রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ব্যাংকটি তিন বছর মেয়াদি এক হাজার কোটি টাকার জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড ইস্যু করবে। বন্ডটির সম্ভাব্য ডিসকাউন্ট রেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এই বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ যোগ্য গ্রাহকদের সবুজ অর্থায়নে ব্যবহার করা হবে। পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা পরিবেশগতভাবে টেকসই বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকটি এই অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে।
জিরো-কুপন বন্ডে সাধারণত নিয়মিত কুপন বা সুদ পরিশোধের পরিবর্তে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বন্ড ইস্যু করা হয় এবং মেয়াদ শেষে নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করা হয়। ফলে এ ধরনের বন্ডের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর রিটার্ন মূলত ক্রয়মূল্য ও মেয়াদ শেষে পাওয়া অর্থের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। ব্যাংক এশিয়া সাত বছর মেয়াদি ৮০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করবে। এ বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ টায়ার-২ মূলধন শক্তিশালী করার পাশাপাশি সবুজ ও টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন এবং পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহার করা হবে।
ফলে ব্যাংকটির বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে একদিকে মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়নের পরিধিও বাড়ানো সম্ভব হবে।
বন্ড ইস্যুর এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের চাপ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ।
একই সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর আয়, তারল্য এবং মূলধন সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ঋণ আদায় না হলে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে সংস্থান রাখতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত মূলধনের ওপরও প্রভাব ফেলে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মূলধন-ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অনুপাত বা সিআরএআর ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’-এও ব্যাংক খাতের মূলধন পরিস্থিতির অবনতির চিত্র উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংক খাতের সিআরএআর ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর বিপরীতে ব্যাসেল-৩ কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সিআরএআর ১০ শতাংশ।
তবে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি চাপের মধ্যে থাকলেও প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা একই নয়। কোনো কোনো ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এর একটি উদাহরণ ব্র্যাক ব্যাংক। ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির সিআরএআর ছিল ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা ওই সময়ের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তার তুলনায় বেশি ছিল।
ফলে পাঁচ ব্যাংকের বন্ড ইস্যুর উদ্যোগকে কেবল মূলধন ঘাটতি পূরণের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। ব্যাংকভেদে বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং বন্ডের কাঠামোও আলাদা।
অনুমোদিত পাঁচ ব্যাংকের বন্ড সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্তভাবে ইস্যু করা হবে না। সবগুলো বন্ডই ব্যক্তিগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি এবং অন্যান্য যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে ইস্যু করা হবে।
এসব বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ নির্দিষ্ট শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি মূলধন বাজারের মাধ্যমে বিকল্প অর্থায়নের পথ ব্যবহার করবে।
ওয়ান ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার বন্ড স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এর ফলে অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী এসব বন্ড পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেনের সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে, বন্ডগুলোর মেয়াদ ও বৈশিষ্ট্য ব্যাংকভেদে ভিন্ন। কোনো ব্যাংক টায়ার-২ মূলধন শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, আবার কোনো ব্যাংক সবুজ ও টেকসই অর্থায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে।
দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন শক্তিশালী করার জন্য বন্ড ইস্যু নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগেও বিভিন্ন ব্যাংক মূলধন বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে।
ব্যাংকের জন্য আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ একটি বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা। বিশেষ করে টায়ার-২ মূলধন বাড়াতে সাব-অর্ডিনেটেড বা অন্যান্য কাঠামোর বন্ড ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ধরনের অর্থ ব্যাংকের মূলধন কাঠামোর একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বন্ড ইস্যু করলেই ব্যাংকের মৌলিক আর্থিক সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। নতুন অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি ঋণের মান উন্নয়ন, খেলাপি ঋণ আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আদায়। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক মধ্যস্থতার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের কাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে শুধু মূলধন বাড়ানো নয়, বরং ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনেও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
ব্যাংকগুলোর বন্ড ইস্যুর অনুমোদনকে মূলধন শক্তিশালী করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যবহূত হচ্ছে এবং ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা কতটা উন্নত হচ্ছে তার ওপর।
বিশেষ করে টায়ার-২ মূলধন বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে। তবে একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ঋণ আদায় জোরদার করা, নতুন ঋণ বিতরণে ঝুঁকি মূল্যায়ন শক্তিশালী করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে ব্র্যাক ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার ক্ষেত্রে সবুজ ও টেকসই অর্থায়নে বন্ডের অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা ব্যাংকিং খাতে বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের গুরুত্বও তুলে ধরছে।
পাঁচ ব্যাংকের ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর অনুমোদন ব্যাংকগুলোর জন্য মূলধন সংগ্রহের একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই অর্থায়নের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ আদায় বাড়ানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং করপোরেট সুশাসন জোরদারের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকছে।